চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরে ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র’ হিসেবে ব্যবহার করা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অভয়ারণ্য ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) অভিযান-পরবর্তী সময়ে জঙ্গল সলিমপুরে স্থাপিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা জানান।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে পাহাড় কাটা, পরিবেশ ধ্বংসসহ নানা অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। তারা এলাকাটিকে কার্যত সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল। এমনকি সেখানে অবৈধ অস্ত্র তৈরি ও বেচাকেনার মতো কার্যক্রমও চলত।’
তিনি জানান, ‘২০২১-২২ সালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হলেও নানা প্রতিকূলতায় তা পুরোপুরি সফল হয়নি। তবে গত ১৯ জানুয়ারি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের ডিএডি মোতালেব সরকার নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। ওই ঘটনার পর সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে জোরালো কার্যক্রম শুরু করে প্রশাসন।’
পরবর্তীতে গত ৯ মার্চ র্যাব, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ প্রায় চার হাজার সদস্যের সমন্বয়ে একটি বৃহৎ যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। জেলা প্রশাসক বলেন, বাহিনীগুলোর সমন্বিত দক্ষতায় কোনো প্রাণহানি ছাড়াই সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরায় নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
অভিযানের পর এলাকায় একটি পুলিশ ও একটি র্যাব ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যা ৯ মার্চ থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক সুবিধার অভাবে ক্যাম্পে দায়িত্বরত সদস্যদের কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে জানান তিনি। স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে খাবার ও পানি সরবরাহ করা হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক বিভিন্ন ক্যাম্প ঘুরে দেখেন এবং দায়িত্বপালনরত সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি প্রায় দুই শতাধিক পুলিশ সদস্যের জন্য মিষ্টি ও তরমুজ নিয়ে যান। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বর্তমান অবস্থা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং ভবিষ্যতে স্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত স্থানসমূহ পরিদর্শন করেন।
যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আলীনগর এলাকার সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। ইতোমধ্যে এলজিইডির মাধ্যমে দ্রুত উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।’
এ ছাড়া এলাকাবাসীর জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক। ইতোমধ্যে দুটি ডিপ টিউবওয়েলের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অস্থায়ীভাবে তাবুর ব্যবস্থা করা হলেও বর্ষা মৌসুম বিবেচনায় টিনের ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ক্যাম্পে দায়িত্বরত র্যাব ও পুলিশসহ প্রায় ২০০ সদস্যের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেট না থাকায় দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বসতি স্থাপন, পাহাড় কাটা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রণহীন এলাকায় পরিণত হয়। ২০২২ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে বিপুলসংখ্যক অবৈধ স্থাপনা অপসারণ ও পাহাড়ি জমি উদ্ধার করা হলেও পরবর্তীতে পুনরায় অবৈধ দখল ও সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধি পায়।
বর্তমানে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং প্রশাসনের উপস্থিতি সুদৃঢ় হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, অবৈধ দখল প্রতিরোধ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘চট্টগ্রামের কোথাও সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য থাকতে দেওয়া হবে না। জঙ্গল সলিমপুরকে একটি আদর্শ, নিরাপদ ও উন্নত এলাকায় রূপান্তর করতে কাজ চলছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখে স্থানীয় জনগণকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।’
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন র্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সৈয়দ মাহবুবুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) শেখ মোহাম্মদ সেলিম, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মতিন এবং সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলামসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন