বাংলাদেশের সমুদ্র বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর এখন আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল রূপান্তরের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। একসময় যেখানে জাহাজের দীর্ঘ অপেক্ষা, কাগজভিত্তিক জটিলতা এবং সীমিত সক্ষমতা ছিল বন্দরের প্রধান চ্যালেঞ্জ, সেখানে এখন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, অটোমেশন, উন্নত যন্ত্রপাতি এবং সেবার মানোন্নয়নের মাধ্যমে বদলে যাচ্ছে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দর। বন্দরে নোঙর করা প্রতিটি জাহাজ এখন শুধু পণ্যই নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনাও নিয়ে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে বন্দরের সব গেটে শতভাগ ই-গেট পাস চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ই-ডেলিভারি অর্ডার (ই-ডিও), অনলাইন এনওসি, ই-চালান, কার্ট টিকিট এবং ওয়ান-স্টপ ডকুমেন্টেশন সম্পূর্ণ কাগজবিহীন করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA World) এবং বন্দরের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের (TOS) মধ্যে সরাসরি তথ্য বিনিময় চালু হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ হয়েছে।
এ ছাড়া ‘সিপিএ স্কাই’ (CPA Sky) নামে সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে কাস্টমস, ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে একই প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। বন্দরের তথ্য ও ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষায় আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও চালু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্দরের অন্যতম বড় অর্জন হলো জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা। পাঁচ বছর আগে যেখানে একটি জাহাজের বন্দরে অবস্থানকাল ছিল তিন দিনেরও বেশি, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৫৮ দিন। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে ২ দশমিক ৩৮ দিনে নেমে এসেছে।
কনটেইনার ও কার্গো পরিচালনাতেও নতুন রেকর্ড গড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। পাঁচ বছর আগে বছরে প্রায় ৩১ লাখ টিইইউ (TEU) কনটেইনার পরিচালিত হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ টিইইউ। একই সময়ে ১৩ কোটি ৮০ লাখ ৭২ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। এছাড়া জাহাজ হ্যান্ডলিং বেড়ে ৪ হাজার ৩৩৬টিতে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬২৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। রাজস্ব উদ্বৃত্ত হয়েছে ৪ হাজার ৩৫৫ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং সরকারকে কর হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে ৯৬০ কোটি ৪ লাখ টাকা। কর-পরবর্তী রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৯৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা বন্দরের আর্থিক সক্ষমতার নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন আধুনিক যন্ত্রপাতি। এর মধ্যে রয়েছে ২টি গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩টি আরটিজি (RTG) ক্রেন, ১৫টি স্ট্র্যাডল ক্যারিয়ার এবং কিউ গ্যান্ট্রি ক্রেনের আধুনিকায়ন। একই সঙ্গে আরটিজি ক্রেনের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা বিভাগ জানায়, আন্তর্জাতিক ISPS Code অনুসারে বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডের আন্তর্জাতিক পরিদর্শনে চট্টগ্রাম বন্দর ‘জিরো অবজারভেশন’ অর্জন করেছে, যা বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অগ্নি নিরাপত্তা জোরদার করতে বন্দরে যুক্ত করা হয়েছে ৫টি ফোম ফায়ার ফাইটিং টেন্ডার, ১টি রেসকিউ ভেহিকেল এবং ১টি রিকভারি ভেহিকেল। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ফায়ার স্প্রিংকলার ও হাইড্রেন্ট ব্যবস্থারও উন্নয়ন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে চট্টগ্রাম বন্দর শুধু বাংলাদেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সশিপমেন্ট ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরের সামগ্রিক সেবার মানোন্নয়নে আমাদের মূল অগ্রাধিকার হচ্ছে গ্রাহকদের জন্য সময়, খরচ ও যাতায়াত (Time, Cost & Visit—TCV) সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা। চট্টগ্রাম বন্দর প্রধানত মেরিন সার্ভিস এবং কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং—এই দুই ক্ষেত্রে সেবা দিয়ে থাকে। উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটি প্রতিযোগিতামূলক, সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্মার্ট বন্দর ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াবে।

