কক্সবাজারের পেকুয়ায় নুর হাসপাতাল নামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকের অবহেলার অভিযোগে আব্দুল্লাহ আল মুয়াজ নামের এক বছরের শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
চিকিৎসকের ভুল সিদ্ধান্ত, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ ছাড়াই অতিরিক্ত স্যালাইন ও একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ এবং সময়মতো কার্যকর চিকিৎসা না পাওয়ায় তাদের সন্তানের প্রাণ গেছে বলে অভিযোগ নিহত শিশুর পরিবারের।
ঘটনাটি ঘটেছে পেকুয়া সদর ইউনিয়নের নুর হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। নিহত শিশু উত্তর মেহেরনামা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ওমর ফারুকের ছেলে।
নিহত শিশুর বাবা বলেন, ‘গত ৩ জানুয়ারি বিকেলে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত অবস্থায় আমার ছেলে মুয়াজকে নুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মনির উল্লাহ শিশুটির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বয়স ও ওজন অনুযায়ী নির্ধারিত মাত্রায় স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেন।’ এতে প্রাথমিকভাবে শিশুটির অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয় বলে দাবি পরিবারের।
পরদিন ৪ জানুয়ারি রাতে দায়িত্বে থাকা শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. জয়নাল আবেদীন চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। পরিবারের অভিযোগ, তিনি শিশুটিকে সরাসরি দেখলেও রক্ত পরীক্ষা, ইলেকট্রোলাইট বা কিডনি ফাংশন পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়াই একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন ও বিপুল পরিমাণ স্যালাইন দেওয়ার নির্দেশ দেন।
শিশুর বাবা ওমর ফারুক বলেন, এক বছরের শিশুর শরীরে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি স্যালাইন দেওয়া হয়। এর ফলে শিশুটির শরীরে পানি জমে যায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং ধীরে ধীরে সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
পরিবারের অভিযোগ, রাতভর শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও অভিযুক্ত চিকিৎসক হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন না। বারবার নার্স ও কর্তব্যরত আবাসিক চিকিৎসককে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ভোরের দিকে শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ৫ জানুয়ারি সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে রেফার করা হয়। শিশুটিকে চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের দাবি, পার্কভিউ হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন অতিরিক্ত স্যালাইন ও অনুপযুক্ত চিকিৎসা শিশুটির মৃত্যুর পেছনে বড় কারণ হতে পারে।
এদিকে এ ঘটনায় শোকাহত পরিবার নুর হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তারা জেলা সিভিল সার্জনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন ও দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
কক্সবাজার জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদুল্লাহ বলেন, ‘আমি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে চিকিৎসক ডা. জয়নাল আবেদীনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি কল কেটে দেন। পরবর্তীতে বারবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মনির উল্লাহ বলেন, শিশু রোগীদের ক্ষেত্রে স্যালাইন ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে অত্যন্ত সতর্কতা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট প্রটোকল, ওজনভিত্তিক হিসাব ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়া অতিরিক্ত স্যালাইন শিশুর জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় সচেতন মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন