প্রতিদিনের মতোই চলছিল উৎপাদন। সেলাই মেশিনের শব্দে মুখর ছিল গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার টেপিরবাড়ী এলাকার কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেড পোশাক কারখানার পঞ্চম তলা। হঠাৎ এক নারী শ্রমিক মাথা ঘুরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে সহকর্মীরা সামাল দেওয়ার আগেই একই ফ্লোরে একে একে আরও অনেক শ্রমিক বমি, মাথা ঘোরা, পেটব্যথা ও দুর্বলতায় আক্রান্ত হন। মুহূর্তেই পুরো ফ্লোরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে শ্রমিকরা দৌড়ে নিচে নেমে আসেন। হুড়োহুড়িতে কয়েকজন আহত হন। শেষ পর্যন্ত আতঙ্কে উৎপাদন কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকরা জানান, প্রথমে এক নারী শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে একই ধরনের উপসর্গ দেখা দেয় আরও অনেকের মধ্যে। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলে শ্রমিকরা কাজ ছেড়ে অ্যাসেম্বলি পয়েন্টে জড়ো হন। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ অসুস্থ শ্রমিকদের মাওনা চৌরাস্তার আলহেরা হাসপাতালে পাঠায়।
আলহেরা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আবুল হোসাইন জানান, অর্ধশতাধিক শ্রমিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের অধিকাংশই নারী। রোগীদের মধ্যে বমি, পেটব্যথা, মাথা ঘোরা ও দুর্বলতার উপসর্গ দেখা গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে অনেককে বাড়ি পাঠানো হলেও কয়েকজনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
শ্রমিকদের ভাষ্য, একই কারখানার পঞ্চম তলায় গত ২৫ জুন কর্মরত অবস্থায় সুইং অপারেটর লিজা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনা এখনো তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে রেখেছে। ওই ঘটনার পর কর্মপরিবেশ ও কাজের চাপের অভিযোগ তুলে শ্রমিকরা বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুর করেন। এর মধ্যেই আবার একই ফ্লোরে অর্ধশতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তবে কী কারণে শ্রমিকরা অসুস্থ হয়েছেন, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি কারখানা কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসন।
এদিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণের সময় এক সংবাদকর্মীর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে সেটি ফেরত দেওয়া হয়।
কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা সঞ্জীব কুমার দে বলেন, অসুস্থ শ্রমিকদের তাৎক্ষণিক হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাংবাদিকের মোবাইল ফোন নেওয়ার ঘটনাটি ভুল–বোঝাবুঝির কারণে ঘটেছে। পরে ফোনটি ফেরত দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কারখানা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়নি। আতঙ্কিত শ্রমিকরা নিজেরাই কর্মস্থল ছেড়ে চলে গেছেন।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ ভূঁইয়া বলেন, অসুস্থ শ্রমিকদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অসুস্থ হওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ২৫ জুন একই কারখানার সুইং অপারেটর লিজা আক্তার কর্মরত অবস্থায় মারা যান। ওই মৃত্যু ঘিরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ এবং কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ একই কারখানায় অর্ধশতাধিক শ্রমিকের হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

