ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬

দুর্নীতির অভিযোগে নাসিরাবাদ কলেজের অধ্যক্ষ বহিস্কার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম
আহমেদ শফিক। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজের অধ্যক্ষ আহমেদ শফিকের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল ভাউচার ও নিয়োগ-বাণিজ্যের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সাথে তাকে স্থলাভিষিক্ত করে কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. লুৎফর রহমান আকন্দকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সাময়িক বরখাস্ত অধ্যক্ষ আহমেদ শফিক স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের জেলা শাখার সভাপতি ও মহানগর আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। ২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন আহমেদ শফিক। 

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ও মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী সাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ৫ জুলাই সকাল ১১ টায় নাসিরাবাদ কলেজ, ময়মনসিংহ এর গভর্নিং বডির বিশেষ সভায় কলেজের অধ্যক্ষ আহমেদ শফিককে অধ্যক্ষের পদ হতে সাময়িক বরখাস্ত করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে, যা ৮ জুলাই তারিখ হতে কার্যকর হবে। এবং একই সাথে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকুরির শর্তাবলী রেগুলেশন (সংশোধিত) ২০১৯'র ৪ নম্বর ধারার (ক) এর ২.(i) উপধারা মোতাবেক কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. লুৎফর রহমান আকন্দকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব (আর্থিক ও প্রশাসনিক) প্রদান করা হয়েছে, যা আগামী ৮ জুলাই তারিখ থেকে কার্যকর হবে।

এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি বলেও উল্লেখ্য করা হয়।

সুত্র জানায়, নাসিরাবাদ কলেজের অধ্যক্ষ আহমেদ শফিকের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল ভাউচার ও নিয়োগ-বাণিজ্যের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত ও অডিট কমিটি এর সত্যতাও পায়। ততকালীন কমিটি এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কলেজ সুত্র জানায়, আহমেদ শফিকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার অপসারণ দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। পরে তার অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে তদন্তের জন্য ২০২৪ সালে ৭ অক্টোবর ময়মনসিংহের সাবেক অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার তাহমিনা আক্তারকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেন। তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার ছিলের উম্মে সালমা তানজিয়া।

তদন্ত কমিটি দীর্ঘ এক মাস তদন্ত করে আহমেদ শফিকের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল ভাউচারে মাসের পর মাস টাকা উত্তোলন, কলেজ ফান্ডের আড়াই কোটি টাকা হাতে নগদ ও নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং বাণিজ্যের প্রমাণ পায়। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে তিনি এসব করেছিলেন।

পরে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও বিভাগীয় কমিশনার উম্মে সালমা তানজিয়া ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান আকন্দকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা (অডিট) কমিটি গঠন করে দেন।

এই কমিটি ২০১২-১৩ থেকে ২০২৩-২৪ মোট ১২টি অর্থবছরের অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করে ব্যাপক অনিয়ম পান। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৬টি বিলে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৮৮০ টাকা উত্তোলনে অধ্যক্ষের একক স্বাক্ষর, ভুয়া ভাউচার এবং নিয়মের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা উত্তোলনের সত্যতা পান।

একই ভাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১টি বিলে ৬ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬৩ টাকা উত্তোলন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৫টি বিলে ১১ লাখ ৮১ হাজার ৭৫১ টাকা উত্তোলন করেন। বাকি অর্থবছরগুলোতেও একইভাবে অধিকাংশ বিল উত্তোলন করা হয়েছে জানিয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় অডিট কমিটি।

গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী কলেজটির গভর্নিং বডির সভাপতি নির্বাচিত হন। অডিট কমিটির রিপোর্টের সত্যতা যাচাইয়ে আবারও তিন সদস্য কমিটি গঠন করেন তিনি। সেই কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও তা জমা দেয়া হয়নি।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে তিনি এসব দুর্নীতি করেছেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এ বিষয়টি নিয়ে এখন সবাই চুপ ছিলেন। অডিটের একটি হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তিনি ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা নগদ হাতে রেখেছিলেন। পরে তা ব্যয়ের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। 

সাময়িক বরখাস্ত অধ্যক্ষ আহমেদ শফিক বলেন, আমার প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে, আমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দুর্নীতির যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা সম্পুর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা।

কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ও মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী বলেন, বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে অধ্যক্ষকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্ত করা হবে। তদন্তে যদি দুর্নীতির আরও প্রমাণ পাওয়া যায়। তাহলে তাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।