ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জামালপুরে ৫ আসনেই এগিয়ে বিএনপি 

জামালপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৮, ২০২৬, ০৩:২৩ পিএম
বিএনপি প্রার্থীরা।ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

জুলাই আন্দোলনের পর সারাদেশের মতো জামালপুর জেলাতেও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো জেলার পাঁচটি আসনে বিএনপি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে। ভোটের মাঠের বাস্তবতা, প্রাথমিক ফলাফল ও স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জামালপুরে আজ পর্যন্ত বিএনপির একক জয় হয়নি, এবার পাঁচটি আসনেই বিএনপি বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।

জেলার ৫টি সংসদীয় আসন হলো জামালপুর ১, জামালপুর ২, জামালপুর ৩, জামালপুর -৪ ও জামালপুর ৫। ২ হাজার ৩২ বর্গ কিলোমিটারের এই জেলায় ৭ উপজেলা, ৮ পৌরসভা ও ৬৮ ইউনিয়ন রয়েছে। মোট ভোটার সংখ্যা ২২ লাখ ৭০ হাজার ২৩০ জন।

জামালপুর ১ আসন

দেওয়ানগঞ্জ ও বকশিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত জামালপুর ১ আসন। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬১ হাজার ৯১৫ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ১৬ হাজার ২০৭ জন পুরুষ, ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৯৮ জন নারী এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ২ জন। এছাড়াও আসনটিতে নতুন ভোটারের সংখ্যা ৩০ হাজার ২০৮ জন। দীর্ঘদিন এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। তবে আওয়ামী লীগ না থাকা এবং দুই উপজেলা নিয়ে নির্বাচনি আসন হওয়ায়, ভোটের ভগ্নাংশের হিসাব খানিকটা পরিস্কার। এ আসনে মোট ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত (বিএনপি), মুহাম্মদ নাজমুল হক সাঈদী (জামায়াত), মো. আব্দুর রউফ তালুকদার (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) এবং এ. কে. এম ফজলুল হক (জাতীয় পার্টি)।

এ আসনের সাধারণ ভোটাররা জানান, বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের ৪টি শক্তিশালী দলের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিলেও এ আসনে কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে অনেকটা এগিয়ে আছেন। তার সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী আব্দুর রউফ তালুকদারের। তবে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত নির্বাচিত হন এবং নির্বাচিত হয়ে তিনি ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন। তাই এবারের নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত বলেও জানান তারা।

জামালপুর ২ আসন

জেলার ইসলামপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত জামালপুর ২ আসন। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৯৯ হাজার ২৬৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৮ জন, নারী ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬২৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ১ জন। আসনটিতে নতুন ভোটারের সংখ্যা ১৭ হাজার ১৮১ জন।

এ আসনটিতে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন এ. ই. সুলতান মাহমুদ বাবু (বিএনপি), মো. ছামিউল হক ফারুকী (জামায়াত), সুলতান মাহমুদ সিরাজী (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), অর্ণব ওয়ারেস খান (স্বতন্ত্র)। 

এ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের তুমুল লড়াইয়ের আশঙ্কা করছেন সাধারণ ভোটাররা। কারণ হিসেবে তারা জানান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ছামিউল হক ফারুকী এ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। 

একই সঙ্গে এবারের নির্বাচনে সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে চান বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এরই ধারাবাহিকতায় সুলতান মাহমুদ বাবুকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করতে জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীরা এবং জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।

জামালপুর ৩ আসন

মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ এই দুই উপজেলা নিয়ে জামালপুর ৩ আসনটি গঠিত। এ আসনটিতে ১৮টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভা রয়েছে। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৭৭ হাজার ১৮৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৭৪ হাজার ২৫৮ জন, নারী ২ লাখ ৬৫ হাজার ২৩৯ জন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৬ জন এবং নতুন ভোটার রয়েছে ৩৭ হাজার ৬৮৪ জন।

এ আসনটিতে ৯ জন প্রার্থী তাদের প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা হলেন মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল (বিএনপি), মো. মজিবুর রহমান আজাদী (জামায়াত), মীর সামসুল আলম লিপটন (জাতীয় পার্টি), ফিদেল নঈম (গণসংহতি আন্দোলন), মোহাম্মদ দৌলতুজ্জামান আনছারী (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), লিটন মিয়া (গণঅধিকার পরিষদ), ফারজানা ফরিদ (স্বতন্ত্র), সাদিকুর রহমান সিদ্দিকী শুভ (স্বতন্ত্র), শিবলুল বারী রাজু (স্বতন্ত্র)।

তৃণমূলের ভোটারদের কাছ থেকে জানা যায়, জামালপুর ৩ আসনে প্রার্থী বেশি থাকায় কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের পথ অনেকটাই পরিষ্কার। যদিও এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সদ্য বহিষ্কৃত উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদিকুর রহমান সিদ্দিকী। তবে তাকে নিয়ে চিন্তিত নন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

জামালপুর ৪ আসন

জেলার সরিষাবাড়ি উপজেলা নিয়ে এ আসন গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ২০ হাজার ৭২৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫১ হাজার ৫২৮ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৬৩ জন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ জন এবং নতুন ভোটার ১৫ হাজার ৭৩১ জন।

এ আসনে ৬ জন প্রার্থী তাদের প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন। তারা হলেন মো. ফরিদুল কবীর তালুকদার (বিএনপি), মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল (জামায়াত), মো. আলী আকবর (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), মো. মাহবুব জামান জুয়েল (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি—সিপিবি), মো. ইকবাল হোসেন (গণঅধিকার পরিষদ), মো. কবির হাসান (নাগরিক ঐক্য)।

জামালপুর জেলা বিএনপির সভাপতি মো. ফরিদুল কবীর তালুকদার শামীম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে একক রাজত্ব কায়েম করছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় আইন ও বিচার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদারের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীককে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধ কাজ করছেন সরিষাবাড়ির আপামর জনগণ।

জামালপুর ৫ আসন

জেলার ৫টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে চিহ্নিত জামালপুর ৫ আসন।  সদর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ১১ হাজার ১৩৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮১ হাজার ৭৪৬ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৯৫ হাজার ৫২ জন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১০ জন এবং নতুন ভোটার ৩৪ হাজার ৩২৮ জন।

এ আসনে মোট ৮ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে, অ্যাডভোকেট শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন (বিএনপি), মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার (জামায়াত), সৈয়দ ইউনুছ আহাম্মদ (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), শেখ মো. আক্কাস আলী (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি—সিপিবি), আবু সায়েম মোহাম্মদ সা-আদাত-উল করীম (বাংলাদেশ কংগ্রেস), মো. বাবর আলী খান (জাতীয় পার্টি—জেপি), মো. আমির উদ্দিন (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জেএসডি) ও জাকির হোসেন (গণঅধিকার পরিষদ)।

সাধারণ ভোটাররা জানান, এ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন জেলা জামায়াতের আমির মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার এবং ধানের শীষের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তিনিই। তবে সেটা কতটা নিকটবর্তী, তা বলা মুশকিল। কেননা এ আসনে ভোটের লড়াইয়ে ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন অনেক এগিয়ে। এর আগে আওয়ামী লীগের আমলে জামালপুর পৌরসভার মেয়র হিসেবে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন জনপ্রিয় এই নেতা।

দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক চাপে থাকা দলটি নতুন করে জনসমর্থনের ভাষা খুঁজে পেয়েছে, যা এ জেলার রাজনীতির মাঠ ও নির্বাচনি আবহাওয়ায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন, সংগ্রাম ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, সব মিলিয়ে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান জামালপুর জেলা বিএনপির জন্য কেবল প্রতিরোধ নয়, পুনরুত্থানেরও বাণী নিয়ে এসেছে।