যশোরের শার্শা উপজেলায় ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের কারণে কোল্ড ইনজুরিতে বোরো ধানের বীজতলা নষ্ট হচ্ছে। এতে বোরো চাষিরা চরম বিপাকে পড়েছেন। শীতের প্রভাবে বীজতলার চারা বিবর্ণ হয়ে হলুদ ও লালচে রং ধারণ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চাষিরা বীজতলায় ছাই ছিটানো, ওষুধ প্রয়োগ এবং পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছেন। তবুও বোরো ধানের বীজতলা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে বোরোসহ প্রায় সব ধরনের ফসলের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চলতি পৌষ মাসের শুরু থেকেই এ এলাকায় তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।
চলতি মৌসুমে শার্শা উপজেলায় ২৩ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বীজতলা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক হাজার ১৭৫ দশমিক ৫ হেক্টর। তবে ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের কারণে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৪০ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। বাকি জমিতে এখনো চারা দেওয়া যায়নি।

এরই মধ্যে যেটুকু বীজতলা তৈরি হয়েছে, তার বড় একটি অংশ শৈত্যপ্রবাহের কারণে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিস্থিতি আরও এক সপ্তাহ অব্যাহত থাকলে চারাগুলো রোপণের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যশোর বিমানবাহিনীর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ঘাঁটিস্থ আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, পৌষ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে যশোরে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়ে বর্তমানে তা মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে রূপ নিয়েছে। জেলায় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে অবস্থান করছে।
গত ১০ দিনের মধ্যে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা পাঁচ দিন যশোরে রেকর্ড হয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকেই শার্শা এলাকায় ঘন কুয়াশা ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে কৃষি খাত ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বোরো ধানের বীজতলা রয়েছে চরম ঝুঁকিতে।
কৃষকরা জানান, ইতোমধ্যে বীজতলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চারা হলুদ ও লালচে রং ধারণ করছে। গত সপ্তাহে যারা বীজতলায় ধান ফেলেছিলেন, তাদের অনেকের চারা অঙ্কুরোদগম হয়নি।
শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে চারাগুলো হলুদাভ হয়ে মরে যাচ্ছে, যা ‘কোল্ড ইনজুরি’ নামে পরিচিত। এতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ নষ্ট চারা পুনরায় কিনতে হতে পারে। বাড়তি যত্ন নেওয়ার পরও চারাগুলোকে হলদে হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না।
কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বীজতলা ঢেকে রাখা, প্রতিদিন সকালে চারার ওপর জমে থাকা কুয়াশা ঝেড়ে ফেলা, নিয়মিত সেচ দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শার্শার শ্যামলাগাছী গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, গত কয়েক দিনের কুয়াশার কারণে ধানের চারা হলুদ হয়ে গেছে। রাতে পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখছি। শীত ও কুয়াশা আরও বাড়লে কোল্ড ইনজুরি থেকে বীজতলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে।
অগ্রভুলোট গ্রামের কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন, আমি দুই বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছি। শীত ও কুয়াশা অব্যাহত থাকলে বীজতলা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।

বেনাপোলের নারায়ণপুর গ্রামের কৃষক জাইদুল ইসলাম বলেন, এক বিঘা জমি প্রস্তুত করেছি, কিন্তু হঠাৎ শীতের তীব্রতা বাড়ায় বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো চারা রোপণ করতে পারছি না।
নাভারনের বুরুজবাগান গ্রামের কৃষক ইয়ানুর রহমান বলেন, প্রতি বছর ৬ থেকে ৮ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করি। এবারও একই পরিমাণ জমিতে আবাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চারা নিয়েই দুশ্চিন্তা বেশি। রোপণের উপযোগী হওয়ার আগেই চারা হলুদ হয়ে যাচ্ছে। কুয়াশার প্রভাব কমানো যাচ্ছে না।
শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা বলেন, এ উপজেলায় ব্রি ধান-৫০, ৬৩, ৮৮, ১০০, ১০২, ১০৪, বিনাধান-২৫, রড মিনিকেট ও শুভলতা জাতের চাষ বেশি হয়। কিছু এলাকায় শীত ও কুয়াশার কারণে চারার ক্ষতি হয়েছে, তবে পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ হাজার ৪৩০ হেক্টর।
বীজতলা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা এক হাজার ১৭৫ দশমিক ৫ হেক্টর। এ পর্যন্ত ১৪০ হেক্টর জমিতে রোপণ করা হয়েছে এবং কার্যক্রম চলমান। বীজতলা রক্ষায় কৃষকদের নিয়মিত সেচ দেওয়া, কুয়াশা ঝেড়ে ফেলা, সালফারজাতীয় ছত্রাকনাশক ব্যবহার এবং রাতে সাদা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন