ঢাকা রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

বেনাপোল স্থলবন্দরে পণ্য পাচার, আনসার সদস্যসহ আসামি ১১

বেনাপোল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২৬, ১০:০৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত

যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে কাগজপত্রবিহীন একটি পণ্যবাহী ভারতীয় ট্রাক জব্দ করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় একটি বাংলাদেশি ট্রাক ও এর চালককে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরের আনসার সদস্য ও বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ব্যক্তিদের আসামি করে মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

শনিবার (২৭ জুন) রাতে বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে বেনাপোল পোর্ট থানায় মামলাটি দায়ের করে। মামলাটি করেন বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. ওবাইদুল মিয়া।

বন্দর ও কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, ঝিকরগাছার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স আরাফ এন্টারপ্রাইজের নামে সরিষার খৈলবাহী একটি ভারতীয় ট্রাক গত ২৩ জুন রাত ৯টার দিকে বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করে। পরে ২৫ জুন ট্রাকটি ৩৫ নম্বর শেডে খালাসের জন্য যাওয়ার তথ্য দেখিয়ে বের হয়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, ভারতীয় ট্রাকটিতে থাকা অবৈধ ৫০ বস্তা দামি শাড়ি, থ্রিপিস ও কসমেটিকস পণ্য ৩২ নম্বর ইয়ার্ডে একটি বাংলাদেশি ট্রাকে স্থানান্তর করা হয়। এরপর ভারতীয় ট্রাকটি বিকেল ৫টার দিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ৩১ নম্বর ইয়ার্ডে প্রবেশ করলে সেটি আটক করা হয়। খবর পেয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামীর উপস্থিতিতে ট্রাকটি তল্লাশি করা হয়। পরে ট্রাকটি ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডে ওজন করলে ঘোষিত ওজনের তুলনায় ২ হাজার ৭৮৪ কেজি পণ্যের ঘাটতি ধরা পড়ে। এ সময় ট্রাক থেকে ১৪০ বস্তা সরিষার খৈল এবং ৫০টি খালি বস্তা জব্দ করা হয়। ঘটনার পর ভারতীয় ট্রাকচালক পালিয়ে গেলেও বাংলাদেশি ট্রাক ও এর চালককে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে, পণ্য পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রটি কৌশলে মেসার্স প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সিএন্ডএফ এজেন্টের নাম ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এ অভিযোগ স্বীকার করা হয়নি। ঘটনার পর কাস্টমস, বন্দর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করেছে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক কাজী রতন বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা গেট পাস ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই ছাড়াই ট্রাক চলাচল এবং পণ্য অপসারণে সহযোগিতা করেছেন। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ব্যবহৃত বাংলাদেশি ট্রাকটি শনাক্ত করা হয় এবং ট্রাকচালক ও হেলপারকে আটক করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘অপরাধ দমনে বন্দর কর্তৃপক্ষ জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বন্দরের নিরাপত্তাকর্মী, ট্রাকচালকসহ সংশ্লিষ্ট ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পরবর্তীতে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদেরও মামলায় যুক্ত করা হবে।’

বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। তবে তদন্তের স্বার্থে আসামিদের নাম প্রকাশ করেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বেনাপোল আমদানি-রফতানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জানান, বন্দরে প্রবেশ করা প্রতিটি আমদানিকৃত ট্রাক প্রথমে বিজিবির তল্লাশির পর কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের যৌথ ওজন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। এরপর উন্নতমানের স্ক্যানিং মেশিনে পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া বন্দরের প্রায় ৩৭৫টি সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি রয়েছে। এত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও অসাধু চক্রের একটি অংশ যোগসাজশ কিংবা নজরদারির ফাঁক-ফোকর ব্যবহার করে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য প্রবেশ করাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি বন্দরের বাণিজ্যিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, চলতি মাসে কাস্টমসের দায়ের করা পণ্য পাচারের আগের তিনটি মামলায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে বৈধ পথে আমদানিকৃত পণ্য পাচার ও অনিয়ম রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।