ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ঝালকাঠি-১ আসনে জমে উঠেছে বিএনপি-জামায়াত লড়াই

ঝালকাঠি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনে নির্বাচনি মাঠে সরব হয়ে উঠেছে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্রাম, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, পথসভা ও কর্মীসভায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা।

রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নেই এখন বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা চলছে। কোথাও আলোচনায় আসছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আবার কোথাও গুরুত্ব পাচ্ছে আদর্শিক রাজনীতির বার্তা। এতে করে ভোটের মাঠে দুই ভিন্ন ধারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

একদিকে বিএনপির প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ড. ফয়জুল হক। দুই প্রার্থীর টানা প্রচারণায় এই আসনের ভোটের সমীকরণ দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।

ঝালকাঠি-১ আসনে (রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া) দুই উপজেলা নিয়ে মোট ১২টি ইউনিয়ন ও ৯০টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ১৬ হাজার ৪২৭ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ১২ হাজার ৩ জন।

বিএনপির প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল এই আসনের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। তিনি ২০০৮ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এতে করে তিনি ঝালকাঠি-১ আসনে একটি পরিচিত রাজনৈতিক মুখ হিসেবে পরিচিতি পান।

২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি প্রায় ৪০ হাজার ভোট পান। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এবারও তিনি নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। প্রতিদিন দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গ্রাম, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নভিত্তিক সভা ও গণসংযোগ করছেন তিনি।

রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে রাজনীতি করেন। ইসলামি মূল্যবোধ, জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই তার রাজনীতির মূল লক্ষ্য। নির্বাচিত হলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে কাজ করবেন বলেও জানান তিনি।

তার বক্তব্যে নদীভাঙন, মাদক সমস্যা, কৃষি সংকট ও শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়টি উঠে আসে। তিনি বলেন, এসব সমস্যা সমাধান ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। পাশাপাশি ঝালকাঠি শহর থেকে আমুয়া পর্যন্ত একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণকে তার অন্যতম প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরেন।

তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং রফিকুল ইসলাম জামালের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। স্থানীয়ভাবে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় থাকায় ভোট বিভাজনের আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে আদর্শিক রাজনীতি ও জোটের শক্তি নিয়ে ড. ফয়জুল হক দিন-রাত প্রচার চালাচ্ছেন।

জামায়াতে ইসলামী ও দশ দলীয় জোটের প্রার্থী ড. ফয়জুল হক এই আসনে তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও অল্প সময়েই আলোচনায় এসেছেন। দাড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে তিনি রাজাপুর ও কাঁঠালিয়ার বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ চালাচ্ছেন।

ড. ফয়জুল হক ওলিয়ে কামেল হযরত কায়েদ সাহেব হুজুর (রহ.)-এর নাতি এবং মাওলানা মুজ্জাম্মিলুল হক রাজাপুরী হুজুরের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। তার জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাজাপুর উপজেলার পশ্চিম চাড়াখালী গ্রামে।

তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে বিএ ও এমএ সম্পন্ন করেন। পরে মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১৯ সালে পিএইচডি এবং ২০২৩ সালে পোস্টডক্টোরাল ফেলোশিপ সম্পন্ন করেন। তার বড় ভাই অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ছাইফুল হক, মেজ ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ শহীদুল হক এবং সেজ ভাই আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আমিনুল হক।

ড. ফয়জুল হক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষ দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বোঝা বহন করছে। মানুষ এখন পরিবর্তন চায় এবং আদর্শভিত্তিক রাজনীতির দিকে ফিরে যেতে চায়।

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী সেই পরিবর্তনের রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করছে। আসন্ন নির্বাচনে দাড়িপাল্লা প্রতীকের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত হলে ঝালকাঠি-১ আসনকে উন্নয়ন ও সুশাসনের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তুলবেন। নদীভাঙন রোধ, যুবসমাজের কর্মসংস্থান, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত প্রশাসন গঠন তার প্রধান অগ্রাধিকার হবে।

এ ছাড়া সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সরাসরি বাজারসংযোগ তৈরির কথাও জানান তিনি।

ড. ফয়জুল হক বলেন, তিনি সব ধর্ম ও শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে রাজনীতি করতে চান। নির্বাচিত না হলেও এলাকার মানুষের পাশে থাকবেন বলেও জানান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঝালকাঠি-১ আসনের নির্বাচন এবার একমুখী নয়। বিএনপির প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামালের রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিচিতি ও ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক। তবে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভাজন তার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটগত প্রচারণা ড. ফয়জুল হককে সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে রেখেছে। আদর্শিক রাজনীতি, পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতা ও দলীয় ঐক্য তার পক্ষে কাজ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি, ভোটারদের সিদ্ধান্ত এবং শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক সমীকরণই শেষ পর্যন্ত ঝালকাঠি-১ আসনের ফল নির্ধারণ করবে।