দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলাতেও কৃষিজমিতে ইঁদুর নিধনের জন্য বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। কৃষকরা একে সহজ সমাধান মনে করলেও এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত কয়েক বছরে এই ফাঁদের কারণে একের পর এক কৃষক প্রাণ হারিয়েছেন। ইঁদুর ও মাঠের অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণী নিয়ন্ত্রণে কৃষকরা নিজেরাই বৈদ্যুতিক ফাঁদ তৈরি করেন।
বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সরাসরি লাইন এনে জমির চারপাশে পাতলা তার বা জালের মতো করে বিছানো হয়। নিয়মিত সকালবেলা এগুলো সরানোর বিধান থাকলেও মাঝে মাঝে ভুলে গেলে প্রাণহানি ঘটে।
নলছিটি উপজেলায় ইতোমধ্যে একাধিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালের ৩০ মার্চ মোল্লারহাট ইউনিয়নের পূর্ব কামদেবপুর গ্রামের লিটন তালুকদার বৈদ্যুতিক ফাঁদ পরীক্ষা করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান।
চলতি বছরের ১৭ মার্চ সুবিদপুর ইউনিয়নের পূর্ব গোদণ্ডা এলাকায় জয়নাল হাওলাদার (৬০) ফাঁদে জড়িয়ে প্রাণ হারান। ৭ ডিসেম্বর ইছাপাশা গ্রামে প্রতিবেশীর বৈদ্যুতিক ফাঁদে মারা যান বাচ্চু মল্লিক (৪৫)।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ঘটনা চাপ ও টাকার বিনিময়ে আপসের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়।
স্থানীয় কৃষক মোঃ তসলিম উদ্দিন বলেন, ইঁদুরের আক্রমণ থেকে ধান ও বীজতলা বাঁচানো দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহার করছেন।
মোঃ রিয়াজ হাওলাদার যোগ করেন, গ্রামের অনেকেই বৈদ্যুতিক ফাঁদের আইনগত নিষেধাজ্ঞা জানেন না।
শিক্ষক মাহবুবুর রহমান মিলন বলেন, বিষয়টি শুধু কৃষকের নয়, পুরো গ্রামের জন্য হুমকি। মাঠে যেহেতু পথঘাট সবার ব্যবহারের জায়গা, তাই কেউ নিশ্চিত থাকতে পারে না কোন খেতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ আছে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের নিয়মিত সচেতনতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ আইনে কৃষিজমিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু নলছিটিতে এ আইন কার্যকর হয়নি। বিদ্যুৎ বিভাগের অভিযান বা কৃষক সচেতন করার উদ্যোগ খুবই সীমিত।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ শিফাত হোসেন বলেন, ইঁদুর দমন নিয়ে কৃষকদের জন্য কোনো প্রশিক্ষণ নেই, তবে মাঠ পর্যায়ে সহজ ও সময়োপযোগী পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ ঝালকাঠির জিএম মোঃ আলতাফ গওহার চৌধুরী বলেন, অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে।
নলছিটিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহার যে ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তা স্পষ্ট। এর থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং স্থানীয় নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে আরও প্রাণহানি ঘটবে, আরও পরিবার অকারণে শোকের বোঝা বহন করবে।


