কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাড়াইল সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় বর্তমানে চরম শিক্ষক সংকটে জর্জরিত। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি ২০১৮ সালের ২৮ মে জাতীয়করণ করা হলেও আজও সেই জাতীয়করণের কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা। প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়টির পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৫৫৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। জাতীয়করণের সময় বিদ্যালয়ের জন্য মোট ১৯টি শিক্ষক পদের সৃষ্টি করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে এসব পদের বিপরীতে পর্যাপ্ত নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৮ জন সহকারী শিক্ষক ও ১ জন জুনিয়র শিক্ষক। পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত রয়েছেন একজন অফিস সহকারী ও একজন অফিস সহায়ক। এত স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে একসঙ্গে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিদ্যালয়টিতে জীব বিজ্ঞান, কৃষি, ভৌত বিজ্ঞান, হিসাব বিজ্ঞান ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। এসব বিষয় মাধ্যমিক স্তরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরীক্ষাভিত্তিক হওয়ায় শিক্ষার্থীরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে। বিকল্প হিসেবে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান কয়েকজন শিক্ষার্থী।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আকাশ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানায়, ‘জীব বিজ্ঞান আর ভৌত বিজ্ঞানের শিক্ষক না থাকায় আমরা শুধু বই পড়ে পড়াশোনা চালাচ্ছি। পরীক্ষার আগে কোনো গাইডলাইন পাচ্ছি না। এতে আমাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত বলেন, ‘হিসাববিজ্ঞান আমাদের ভবিষ্যৎ পড়াশোনার ভিত্তি। কিন্তু এই বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় সিলেবাস শেষ হয়নি। এতে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আমরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি।’
এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকরাও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উপজেলার সাচাইল গ্রামের অভিভাবক দেলোয়ার হোসেন রিপন বলেন, ‘এটি তাড়াইলের সবচেয়ে পুরোনো ও মর্যাদাসম্পন্ন স্কুল। সরকারিকরণ হয়েছে শুনে আমরা আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেই শিক্ষক নেই। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা আতঙ্কিত।’
আরেক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জাতীয়করণের সাত বছর পার হলেও যদি শিক্ষক নিয়োগ না হয়, তাহলে এই সরকারিকরণের অর্থ কী? দ্রুত সমাধান না হলে আমরা অভিভাবকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।’
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শামীমা কাওসার জানান, জাতীয়করণের সময় আমাদের বিদ্যালয়ে ১৯টি শিক্ষক পদের সৃষ্টি হয়। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৯ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। জীব বিজ্ঞান, কৃষি, ভৌত বিজ্ঞান, হিসাব বিজ্ঞান ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। বিষয়টি আমরা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। শিক্ষক নিয়োগ না হলে পাঠদান কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের মতে, একটি পাইলট মডেল স্কুলে এ ধরনের শিক্ষক সংকট দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্রই তুলে ধরে। তারা মনে করেন, দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ ও জনবল কাঠামো শক্তিশালী করা না হলে বিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এলাকাবাসী, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জোর দাবি, অবিলম্বে জীববিজ্ঞান, কৃষি, ভৌত বিজ্ঞান, হিসাব বিজ্ঞান ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগসহ সব শূন্যপদ পূরণ করে বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক পাঠদান ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।




সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন