ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

সরকারি জমি হারিয়ে ভাড়া জমি-সড়কে হাট, কমছে রাজস্ব আয়

লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৩:১৯ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

তদারকির অভাবে সরকারি জমিতে অবৈধ স্থপনা গড়ে উঠায় ​লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার অধিকাংশ হাট বসে ঈদগা মাঠ, ভাড়া জমি আর সড়কের ধারে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো রাজস্ব আদায়ে চরম ভাটা পড়েছে। 

জানা গেছে, উপজেলার রাজস্ব আদায়ের অন্যতম খাতই হাট-বাজার ইজারার অর্থ। উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে প্রায় অর্ধশত হাট ও বাজার বার্ষিক ইজারার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করছে সরকার। আদায়কৃত অর্থের একটা অংশ দিয়ে সেই হাট-বাজারের উন্নয়ন করার কথা থাকলে তা কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবে অবৈধ স্থাপনার দখলে চলে গেছে উপজেলার অধিকাংশ হাট-বাজারের সরকারি জমি। হাট-বাজারের ড্রেনসহ টিউবয়েল বার্থরুমও দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। পানি ও বর্জ নিষ্কাশনের অভাবে বাজারগুলো ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে,  হাট-বাজারের সরকারি জমি প্রভাবশালীরা দখল করে একেক জন ৪-৫টি করে ইচ্ছামতো দোকানঘর ও গুদাম করে ভাড়া দিচ্ছেন। সেই দোকানেও নেওয়া হচ্ছে মোটা অংকের জামানত ও মাসিক ভাড়া। যত্রতত্র বসার কারণে চলাচলের পথও নেই। ফলে ভূতুড়ে পরিবেশে কাদা পানি মাড়িয়ে ব্যবসা করতে বা পণ্য কেনা-বেচার আগ্রহ হারাচ্ছেন ব্যবসায়ী বা হাটুরেরা। এতে একদিকে যেমন হাটের নকশা পরিবর্তন হয়েছে, অন্যদিকে হাটুরের চলাচলের ব্যাঘাত ঘটেছে। ফলে হাট-বাজারের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ ব্যবসায়ীরা মোটা অংকের টাকা জামানত ও মাসিক ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। 

সরকারি জমি দখলদারের দখলে যাওয়ায় ইজারাদাররা বাধ্য হয়ে ভাড়া জমি বা সড়কের ধারে হাট বসাতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ইজারাদাররা। তারা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারি নিয়মের কয়েকগুণ বাড়তি খাজনা আদায় করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সড়কের পাশে হাট বসায়  দুর্ঘটনার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ও কমে যাচ্ছে। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে লিখিত অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না ইজারাদাররা।

উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়িরহাট। সেখানকার সরকারি জমিতে গড়ে উঠেছে দখলদারদের অবৈধ মার্কেট আর মুরগির খামার। অনেকটা বাধ্য হয়ে ঈদগা মাঠ ভাড়া নিয়ে সবজি বাজার বসাতে বাধ্য হয়েছেন ইজারাদার সাইফুজ্জামান ফারুক। তিনি বার্ষিক ১৭ লাখ ৪০ হাজার টাকায় বুড়িরহাট এক বছরের জন্য ইজারা নিয়েছেন। সরকারকে টাকা দেওয়ার পরেও হাট বসাতে ঈদগা মাঠকে আরও অর্ধলাখ টাকা গুণতে হয়েছে। এসব অবৈধ স্থপনা উচ্ছেদ করে জায়গা বুঝে দিতে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে লিখিত আবেদন করেছেন তিনি।

নামুড়ির হাট প্রায় ১২ লাখ টাকায় বার্ষিক ইজারা নিয়েছেন শাহীন মিয়া। তার হাটের জমিও বে দখলে। গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। তার হাটের ড্রেন পর্যন্ত ভড়াট করে দখলদাররা ভবন করে ভাড়া দিয়েছেন। জায়গার অভাবে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রিতে পড়ছে চরম ভোগান্তিতে। বাধ্য হয়ে বসরা বসে লালমনিরহাট বুড়িমারী মহাসড়কের ধারে। 

বুড়িরহাটের ইজারাদার সাইফুজ্জামান ফারুক বলেন, ইজারা প্রদানের সময় উপজেলা প্রশাসন নানান প্রতিশ্রুতি দেন। ইজারার চুক্তি হয়ে গেলে আর খবর রাখেন না। হাটের প্রায় সবটুকু জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা আর মুরগির খামার গড়ে উঠেছে। আমরা অবৈধ স্থপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে হাটের নকশা ঠিক করে দিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনে লিখিত  আবেদন করেছি। কোনো সুফল মেলেনি। জায়গার অভাবে বাধ্য হয়ে ঈদগা মাঠ ভাড়া নিয়ে হাট বসাতে হচ্ছে। এরপরও লোকসান হবে। লোকসানের ভয়ে কেউ হাট-বাজার ইজারা নিতে চান না। 

নামুড়ি হাটের ইজারাদার শাহীন বলেন, সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনার বিষয়ে হাট ইজারা নেওয়ার পরদিনেই উপজেলা প্রশাসনকে লিখিত জানিয়েছি। অবৈধ দরখলদারদের নামের তালিকাও করে দিয়েছি। আজ-কাল বলে ৪ মাস হলেও তদন্তেই সীমাবদ্ধ, উচ্ছেদ আর হলো না। বাধ্য হয়ে সড়কে হাট বসাতে হয়েছে। শুনেছি, দখলদাররা মোটা অংকে টাকা দিয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেছে। তাই হয়তো উচ্ছেদের অভিযান হচ্ছে না। প্রশাসন এমন করলে আগামীতে ইজারাদার খুঁজে পাবে না। হাট-বাজারে মানুষ যাবে না। 

প্রশাসনের নজরদারির অভাবে হাট-বাজারের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তের ভয়ে হাট-বাজার ইজারা নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন ইজারাদাররা। এ কারণে কয়েক বছর ধরে হাট-বাজার ইজারা দিতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে উপজেলা প্রশাসনকে। অনেকটা ডেকে এনে হাট-বাজার ইজারা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবছর ইজারার সময় প্রতিশ্রুতি দিলেও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বা একসনা বন্দোবস্ত দিতে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি উপজেলা প্রশাসন। 

বাজারকারী সাধারণ মানুষের দাবি, হাট-বাজারগুলোর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের একসনা ও কৃষকদের জন্য বাজার ফাঁকা রেখে বাজারগুলো সংস্কার করা হোক। এতে সরকারের রাজস্ব যেমন বাড়বে তেমনি ব্যাবসা-বাণিজ্যের উপযুক্ত পরিবেশ ফিরে আসবে। তখন ইজারা প্রদানেও ভোগান্তি হবে না উপজেলা প্রশাসনের। 

উপজেলা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ইজারাদারের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে নামুড়ির হাটের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে জেলা প্রশাসনের অনুমতির জন্য আবেদন পাঠানো হয়েছে। অনুমতি পেলে কার্যকর করা হবে। অনুরূপভাবে পর্যক্রমে সব হাট-বাজারে এ অভিযান পরিচালনা করে হাট-বাজারের সুষ্ঠ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।