ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

উত্তরে বাড়ছে শীতে, দুর্ভোগে ছিন্নমূল মানুষ

হাসানুজ্জামান হাসান, (কালীগঞ্জ) লালমনিরহাট
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫, ০৪:৩৫ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

হিমালয়ের খুব কাছে অবস্থান হওয়ায় লালমনিরহাট জেলায় শীতের তীব্রতা অনুভূত হচ্ছে একটু আগেভাগেই। উত্তরের এই জেলায় জেঁকে বসতে শুরু করেছে শীত। হিমালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় আগাম শীতের দাপট দেখা যাচ্ছে।

সকাল থেকেই ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় জবুথবু হয়ে পড়েছে জনজীবন। কর্মজীবী মানুষ বিশেষ করে দিনমজুর ও চালকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। ভোররাত থেকেই ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে লালমনিরহাট সদরসহ ৫টি উপজেলা।

রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) জেলায় সর্বনিম্ন ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে।

সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত বৃষ্টির মতো টপ টপ করে ঝরতে দেখা যায় কুয়াশা। মহাসড়কে ধীরগতিতে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলছে বাস, ট্রাক। যাত্রী বা চালকের চিন্তিত মুখ। ঘন কুয়াশায় দৃষ্টিসীমা কমে আসায় লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ্বালিয়ে চলে যানবাহন।

হিমেল বাতাস আর কনকনে ঠান্ডায় স্থবিরতা নেমে এসেছে কর্মজীবী মানুষের জীবনে। পেটের তাগিদে শীত উপেক্ষা করেই কাজে বের হতে হচ্ছে দিনমজুর, কৃষক আর রিকশাচালকদের। দীর্ঘ সময় কুয়াশা থাকায় ঠান্ডায় হাত-পা অবশ হয়ে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাদের। কুয়াশার ঘনত্ব আর হিমেল হাওয়া অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে ভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন এ অঞ্চলের মানুষ।

ঠান্ডাজনিত রোগের কারণে গত কয়েক দিনের মধ্যে লালমনিরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে প্রায় অর্ধশত শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে জায়গা সংকট দেখা দিয়েছে।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট গ্রামের রিকশাচালক এমদাদুল হক বলেন, 'বাড়ি থেকে রিকশা নিয়ে বের হই, কিন্তু ঠান্ডার কারণে রাস্তায় যাত্রী নেই। এক ঘণ্টায় একজন যাত্রীও মেলে না। এতে আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।'

কালীগঞ্জের কাকিনা এলাকার দিনমজুর সোলেমান আলী জানান, 'সকাল ও আইতোত (রাতে) খুব ঠান্ডা নাগে। ঠান্ডাত হামরা কাবু হয়া যাবার নাইকছি। হামার এত্তি ঠান্ডা দিনদিন বাইরবার নাইকছে। এদোন করি ঠান্ডা বাইরলে হামরাগুলা বপদোত পড়ি যামো।’

একই এলাকার কৃষক মনছুর আলী বলেন, 'আমাদের এলাকায় ঠান্ডা সবসময় বেশি থাকে। আমাদের তেমন শীতবস্ত্র নেই। বাজার থেকে কিনতেও পারি না। ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করেই মাঠে নামতে হচ্ছে। সকালে সূর্যের দেখা মিলছে দেরিতে।'

হাতীবান্ধার পারুলিয়া এলাকার আনিছা বেগম বলেন, 'আইতোত জারের ঠ্যালায় নিনবারে না পাই। হামারগুলার খুব কষ্ট হবার নাইকছে। অনেক আইত পর্যন্ত আগুন তাপা নাগে। সকাল বেলাতেও খুব জার নাগে। হামারগুলার তেমন ঠান্ডার কাপড়চোপড়ও নাই।' 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, শীতের প্রকোপের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠান্ডাজনিত রোগ। হাসপাতালটিতে নিউমোনিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশি ও শীতকালীন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা বেড়েছে। আক্রান্ত হওয়া শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন বাবা-মায়েরা। এদিকে শিশুদের পাশাপাশি নানা বয়সী নারী-পুরুষও ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে হাসপাতালটিতে প্রতিদিন বাড়ছে ঠান্ডায় আক্রান্ত রোগীর চাপ। তাদের কারো কারো পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল। এসব রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই।

হাসপাতালে নবজাতক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. তপন কুমার রায় বলেন, শীতের কারণে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি থাকে। ঠান্ডার সময়ে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।

লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল হাকিম বলেন, শীতকাল এলেই ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশু ও বৃদ্ধরা। রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশুদের কোনোভাবেই ঠান্ডা লাগানো যাবে না।

রাজারহাট আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, শনিবার সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। কুয়াশা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে।