গ্রামের চারদিকে সাজসাজ রব। উচ্চস্বরে সাউন্ড সিস্টেমের বাজনা, জবাই হয়েছে গরু। আত্বীয়তা আসছেন দূর-দূরান্ত থেকে দল বেধে। নতুন জামা কাপড় পড়েছে শিশুরা। দেখে মনে হবে অনেক বড় কোনো উৎসব, সত্যিই তাই।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় জমিদার আমলের জমির পরিমাপের সৃষ্ট বিরোধ মিমাংসা করতে সৃষ্টি শক্তি পরীক্ষার বিষয়টি। যা আজ হুম গুটি খেলায় পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর পৌষের শেষ বিকালে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় এই খেলা। খেলায় কোনো পুরস্কার না থাকলেও ২৬৭তম হুম গুটি খেলার আসরকে ঘিরে সাজসাজ রব বিরাজ করে।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার দেওখোলা ইউনিয়নের জমিদার আমলের তালুক-পরগনা সীমানার বড়ই আটা নামক স্থানে পৌষের শেষ বিকাল বুধবার (১৪ জানুয়ারি) খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় বিজয়ী দল হিসাবে ঘোষণা করা হয় পূব্বা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রত্যেক বাড়িতে এসেছে আত্নীয়-স্বজন। শিশুদের জন্য কেনা হচ্ছে নতুন জামা কাপড়। ঠিকঠাক করে সুর তোলা হচ্ছে পুরনো বাদ্যযন্ত্রে। পিঠাপুলি বানানোর সমস্ত আয়োজন শেষ করছেন গৃহবধূরা।
অনুষ্ঠানের জন্য এই দিনটি এমনভাবে নির্ধারিত যে নতুন করে আর কোনো দিনক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না। সময়মতো লাখো মানুষের জমায়েত ঘটে চিরচেনা এই খেলার মাঠে।
পিতলের তৈরি ১ মণ ওজনের গুটি করায়াত্ত করে নিজ গ্রামে নিয়ে গুম করা পর্যন্ত চলে এই খেলা। আর এই খেলাকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়িয়া উপজেলার গ্রামে গ্রামে চলে অন্যরকম উৎসাহ উদ্দীপনা। গোটা পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। ফুলবাড়ীয়ার লক্ষীপুর ও ১০ মাইলের মাঝামাঝি বড়ই আটা মাঠ খেলার কেন্দ্রস্থল।
বিকাল ৪টার দিকে খেলা শুরু হয়। এর আগে সকাল থেকে ফুলবাড়িয়া ছাড়াও ত্রিশাল, মুক্তাগাছা উপজেলা ও সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার লোকজন আসতে থাকে লক্ষ্মীপুর বড়ই আটা মাঠে। সড়কের অদূরে ভাটিপাড়া, বালাশ্বর, তেলিগ্রামের সংযোগস্থল নতুন সড়কে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।
মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্তের সঙ্গে ত্রিশালের বৈলরের হেম চন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশে, পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৬ শতাংশ।
একই জমিদারের ভূখণ্ডে দুই নীতির তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসার জন্য লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটা নামক স্থানে প্রথমবারের মতো ১৭৫৯ সালে আয়োজন করা হয় এই গুটি খেলার। শর্ত ছিল, গুটি যে দিকে যাবে তা হবে তালুক, পরাজিত অংশের নাম হবে পরগনা।
জমিদার আমলের গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হন। তালুক পরগনার সীমান্তে জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদারি খেলার গোড়াপত্তন। আমন ধান কাটা শেষ, বোরো ধান আবাদের আগে প্রজাদের শক্তি পরীক্ষার জন্য জমিদার আমলের এই খেলা চলছে বছরের পর ধরে।
ঐতিহ্যবাহী খেলাটির নেই কোনো রেফারি, নেই কোনো খেলার শেষ সময়। যে জিতুক আবার গিয়ে গুডি ধররে, বল ১ মণ ওজনর পিতলের গুটির ওপর হুমরি খেয়ে পড়ে শতশত খেলোয়াড়। গুটি খেলার ১ মণ ওজনর পিতলের গুটিটি বংশানুক্রমিক সংরক্ষণ করে আসছ লক্ষীপুরর মোড়ল পরিবার। মোড়ল পরিবারর গুটি সংরক্ষক আবু মিয়া জানান, তার বাবা-দাদা এ গুটি সংরক্ষণ করছেন।
স্থানীয় প্রবীণ সাংবাদিক ওমর ফারুক বলেন, পিতলের তৈরি কমলালেবুর মত বস্তুটি শুরু থেকে ৪০ কেজি ওজনের হলেও গত মঙ্গলবার দেখে মনে হয়েছে যুগের পর যুগ খেলা চলতে থাকার কারণে হয়তো এখন ২৫/৩০ কেজি ওজন হবে।
তিনি আরও বলেন, পিতলের বল মাঝখানে রেখে চারদিক থেকে আসা খেলোয়াড়রা পর্যায়ক্রমে খেলতে থাকে অনেকটা কেড়ে নেওয়ার মত। তবে এই খেলাতে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হচ্ছে জন্মভূমির প্রতি অগাত ভালোবাসা।
কারণ যারা এ খেলায় অংশগ্রহণ করে তাদের মাঝেই এটা কাজ করে, যে আমার দিকটাই জিতবে। খেলা শেষে সবার মুখে একটি কথাই শোনা যায়। গুটি কই গেল। খেলা শুরু হওয়ার সময় সীমা বাধা থাকে না। কোনো কোনো বছর সারা রাত খেলা চলে। তবে এবারে সন্ধ্যার পর পরই খেলা শেষ হয়ে যায়।
সাংবাদিক এনায়েতুর রহমান বলেন, খেলা শুরু হওয়ার আগে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও লাখ জনতার উপস্থিতি দেখে একপর্যায়ে প্রশাসন চুপ হয়ে যায়। রাত ৮টার পর শান্তিপূর্ণভাবে খেলা শেষ হয়।
-20260115081834.webp)



