ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

এক বছর ধরে বন্ধ ময়মনসিংহের পাঁচ লোকাল ট্রেন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ইঞ্জিন সংকটের কারণে এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে ময়মনসিংহ থেকে ভৈরব লোকাল, দেওয়ানগঞ্জ লোকাল, মোহনগঞ্জ লোকাল, জারিয়া লোকাল ও ধলেশ্বরী এক্সপ্রেস। ফলে এই রুটগুলোতে যাতায়াতকারী হাজার হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। কবে এই ট্রেনগুলো চালু হবে তা এখনো জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, জারিয়া লোকাল ট্রেন গত এক মাস আগে থেকে বন্ধ ছিল। তবে ট্রেনের ইঞ্জিন এসে পৌঁছেছে এবং আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে ওই রুটে চলাচল শুরু হবে।

ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন সুপার আব্দুল্লাহ আল হারুন পাঁচ ট্রেন এক বছর ধরে বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

রেলওয়ে স্টেশন সূত্র জানায়, ভৈরব লোকাল ময়মনসিংহ থেকে ভৈরব, মোহনগঞ্জ লোকাল ময়মনসিংহ থেকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, জারিয়া লোকাল ময়মনসিংহ থেকে জারিয়া, ধলেশ্বরী এক্সপ্রেস ময়মনসিংহ থেকে জামালপুর হয়ে টাঙ্গাইলের ভুয়াপড়া পর্যন্ত চলাচল করে।

সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ থেকে জারিয়া, মোহনগঞ্জ, ভৈরব ও দেওয়ানগঞ্জ লোকাল ট্রেনগুলো নেত্রকোনা জেলার নেত্রকোনা কোর্ট, হিরনপুর, অথিতপুর, চল্লিশা, বাংলা, ঠাকুরাকোণা, বারহাট্টা, মোহনগঞ্জ, শ্যামগঞ্জ, পূর্বধলা, জালসুকা, জারিয়া জাঞ্জাইল, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা এবং ময়মনসিংহ জেলার শম্ভূগঞ্জ, গৌরীপুর, বিসকা, তারাকান্দা এবং সুনামগঞ্জ জেলার ধরমপাশা, বাদশাগঞ্জ, মধ্যনগর, তাহেরপুর, জয়শ্রী, দিরাই, রাজনগরসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলের যাত্রী চলাচলের প্রধান মাধ্যম।

এই এলাকার মানুষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও বিভিন্ন পেশার হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এ ট্রেনে যাতায়াত করেন।

লোকাল ট্রেনগুলি কোনো নোটিশ ছাড়াই বন্ধ থাকায় যাত্রীদের জন্য চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিকল্প হিসেবে তারা বেশি ভাড়া দিয়ে বাস বা সিএনজি চালিত অটোরিকশা ব্যবহার করছেন। বাসে যাতায়াতের কারণে জ্যামের মধ্যে পড়ে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মালামাল পরিবহনেও অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এ ছাড়া চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে সরেজমিনে দেখা যায়, ইঞ্জিন সংকটের কারণে লোকাল ট্রেন দুটি স্টেশনের প্লাটফর্মের বাইরে দাঁড় করানো হয়েছে। ট্রেনে ফ্যান আছে, কিন্তু ঘোরে না; জানালা আছে, কিন্তু শাটার নেই; বাতি আছে, কিন্তু জ্বলে না। সন্ধ্যার পর কম্পার্টমেন্ট অন্ধকারে ভরে যায়।

বগিতে শৌচাগার আছে, তবে পানি নেই। ট্রেনের ভিতরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং দুর্গন্ধ রয়েছে। আসনগুলোর অবস্থাও বেহাল। কিছু আসন ছিঁড়ে গেছে এবং নারিকেলের ছোবড়া বেরিয়ে আছে। নিয়মিত যাত্রীরা জানাচ্ছেন, এই ট্রেন কখনো সময়মতো চলে না।

তবুও নিরাপদ এবং কম ভাড়ার কারণে এই ট্রেনের যাত্রী চাহিদা ব্যাপক। নানা ভোগান্তির মধ্যেও ভাটি অঞ্চলের মানুষ এই ট্রেনে ছুটে যান। সারা বছর এই ট্রেনে যাত্রীদের ভিড় থাকে।

রেলওয়ে বিভাগ সূত্র জানায়, ১৯১৮ সালে ময়মনসিংহ-জারিয়া রুটে প্রথম জারিয়া লোকাল ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিদিন ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার হাজার হাজার যাত্রী এতে চলাচল করেন। ময়মনসিংহ রেলস্টেশন থেকে মাত্র পাঁচটি বগি নিয়ে জারিয়া জাঞ্জাইল স্টেশন পর্যন্ত দিনে চারবার আসা-যাওয়া হয়।

হাওরের রাজধানী খ্যাত মোহনগঞ্জ উপজেলা দেশি মাছের জন্য বিখ্যাত। একসময় এ অঞ্চলে ব্যাপক পাট উৎপাদন হতো। এজন্য ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার মাছ ও পাট পরিবহনের জন্য ময়মনসিংহ থেকে মোহনগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করেছিল। মোহনগঞ্জ লোকাল ট্রেন প্রতিদিন সকাল ও বিকেল দুইবার পাঁচটি বগি নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে মোহনগঞ্জ স্টেশনে চলাচল করে।

নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার বাসিন্দা আনিছুর রহমান বলেন, কোনো নোটিশ ছাড়াই কিছুদিন পরপর ট্রেনটি বন্ধ থাকে। তিনি যাত্রীদের ভোগান্তি লাঘবের জন্য দ্রুত ট্রেন চালুর দাবি জানিয়েছেন।

নেত্রকোনার কামাল হোসেন বলেন, ময়মনসিংহ থেকে জারিয়া-জানঞ্জাইল রুটে আন্তনগর কোনো ট্রেন নেই। বর্তমানে লোকাল ট্রেনও ইঞ্জিন সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে।

এ অঞ্চলের যাত্রীরা জানান, তারা দীর্ঘ সময় ট্রেন চলাচলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সড়কপথে তাদের জন্য চলাচল কষ্টকর। তাই দ্রুত ট্রেন চালুর দাবি তাদের।

ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন সুপার আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন, ময়মনসিংহ থেকে চলাচল করা লোকাল ট্রেনগুলো ইঞ্জিন সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে। দ্রুত ইঞ্জিনের সমস্যা সমাধান করে ট্রেনগুলো চালু করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ময়মনসিংহ থেকে চলাচল করা লোকাল ট্রেনগুলোর জন্য অন্তত ১২টি ইঞ্জিন প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমানে আছে মাত্র দুটি। বিকল হওয়া ইঞ্জিনগুলো ঢাকা, রাজশাহী ও সৈয়দপুর লোকোশেডে মেরামতের জন্য পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে লোকোশেড ইনচার্জ মাসুদ আহমেদ জানান, লোকোমোটিভের প্রাপ্যতা না থাকায় এই লোকাল ট্রেনগুলো চালানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রাপ্যতা স্বাভাবিক হলে ট্রেনগুলো চালানো সম্ভব হবে। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে অবগত আছেন।