নওগাঁ জেলা প্রেসক্লাবের দুই পক্ষের পৃথক আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে জেলায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। উভয় পক্ষই নিজেদের কমিটি বহাল রাখা এবং অবস্থান শক্ত করতে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে তৎপরতা চালাচ্ছে। এতে জেলার সংবাদকর্মী ও সচেতন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন—প্রেসক্লাবটি আসলে কার নিয়ন্ত্রণে?
জানা গেছে, জেলা শহরের উকিলপাড়ায় অবস্থিত প্রেস ক্লাবটিতে গত কয়েক বছর ধরে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ চলছে। অভিযোগ রয়েছে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এনে বহিষ্কার করা হয়েছে। এমনকি তাদের প্রেসক্লাবে প্রবেশাধিকারও বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে নিজেদের অনুসারীদের সদস্যপদ দিয়ে ভোটার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
গত এক দশকে একাধিকবার কমিটি পরিবর্তন, সদস্য বহিষ্কার এবং অসাংবাদিকদের সদস্যপদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে অনেক সিনিয়র সাংবাদিক সদস্যপদ হারিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও জাতীয় পত্রিকায় কর্মরত প্রায় ৩০ জন তরুণ সাংবাদিক সদস্যপদ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে বঞ্চিত ও বহিষ্কৃত সাংবাদিকরা প্রেসক্লাবের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে নতুন তালা লাগিয়ে চাবি জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেন। এ ঘটনায় প্রায় ১৫ দিন প্রেস ক্লাবটি বন্ধ ছিল। পরে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের মধ্যস্থতায় নির্বাচন আয়োজন এবং বহিষ্কৃতদের সদস্যপদ পুনর্বহালসহ নতুনদের অন্তর্ভুক্তির শর্তে সমঝোতা হয়। তবে অভিযোগ, নতুন কমিটি গঠনের পর সেই শর্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি।
সর্বশেষ, গত ৩ মার্চ অ্যাডভোকেট শওকত ইলিয়াস কবিরকে আহ্বায়ক করে একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে এক পক্ষ। অপরদিকে, ২৯ মার্চ প্রফেসর ওয়ালিউল ইসলামকে আহ্বায়ক করে আরেকটি কমিটি ঘোষণা করে সদ্য বিলুপ্ত কমিটি।
এ বিষয়ে বহিষ্কৃত সদস্যদের পক্ষের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নবীর উদ্দীন বলেন, ‘আমাকে না জানিয়েই আহ্বায়ক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমি এসব দ্বন্দ্ব চাই না। প্রেস ক্লাব আমাদের সবার সংগঠন—এটি শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত।’
অন্যদিকে, সদ্য বিলুপ্ত কমিটির পক্ষের আহ্বায়ক প্রফেসর ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, ‘নওগাঁর সুনাম রক্ষায় আমরা চাই আলোচনা মাধ্যমে সমাধান হোক। আগামী শুক্রবার উভয় পক্ষ বসে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবে।’
নওগাঁ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি আশরাফুল নয়ন বলেন, ‘গত বছরও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং ১৫ দিন প্রেসক্লাব বন্ধ ছিল। জেলা প্রশাসকের মধ্যস্থতায় সমাধান হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে আবারও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। নেতৃত্ব দীর্ঘায়িত করার প্রবণতা থেকেই এসব দ্বন্দ্ব হচ্ছে, যা সাংবাদিক সমাজের জন্য ক্ষতিকর।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব কারণে অসাংবাদিকদের সদস্যপদ দেওয়া হচ্ছে, যা মূলধারার সাংবাদিকদের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। দ্রুত এর সমাধান প্রয়োজন।’
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি সাংবাদিকদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে সাংবাদিকদের একাধিক গ্রুপ রয়েছে। তারা নিজেরা সমাধান না করলে বিষয়টি কঠিন হয়ে পড়ে। লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব। এ ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্যও চাইলে সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারেন।’
দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই দ্বন্দ্বে জেলার সাংবাদিক সমাজের ঐক্য ও পেশাগত পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তারা দ্রুত একটি স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

-20260401195043.webp)
সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন