রাণীনগর উপজেলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, আত্মীয়করণ, পরিবেশবিরোধী ও নিম্নমানের শিক্ষা কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থী সংকটের তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে।
এসব কারণে অনেক কেন্দ্র জোড়াতালি দিয়ে কার্যক্রম চালালেও প্রকৃত অর্থে কার্যক্রম ধুঁকে ধুঁকে চলছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাগজে-কলমে পরিচালিত একটি কেন্দ্রের নাম “লোহাচুড়া পশ্চিমপাড়া কাচারি, রাণীনগর”। সেখানে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে আছেন মোছা. কাজল রেখা। তবে তিনি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে পাঠদান না করে একটি বাড়িতে পাঠদান করছেন বলে জানা গেছে।
ওই বাড়িতে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের সাইনবোর্ড থাকলেও নিচে হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনের দৃশ্য দেখা গেছে। প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের এই কেন্দ্রে ৩০ জন শিক্ষার্থীর জায়গায় মাত্র ৭-৮ জন শিশু উপস্থিত থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষক মোছা. নুসরাত জাহান সূচির কেন্দ্র আমগ্রাম জামে মসজিদে কোনো শিক্ষা কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তার বর্তমান কেন্দ্র আসমাইল হাজীর কাচারী হলেও সেটিও প্রায় তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত সমন্বয় সভায়ও উপস্থিত থাকেন না, তবুও নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন।
এভাবেই রাণীনগর উপজেলায় মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন এই প্রকল্পে ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মুসার বিরুদ্ধে অবহেলা, স্বেচ্ছাচারিতা, পক্ষপাতিত্ব ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন একাধিক শিক্ষক ও স্থানীয়রা। অভিযোগ অনুযায়ী, তার তত্ত্বাবধানে অনেক কেন্দ্র কার্যত অকার্যকর হলেও কাগজে-কলমে সচল দেখানো হচ্ছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মুসার স্ত্রী নুসরাত জাহান সূচি এবং শ্বাশুড়ি কাজল রেখা একই প্রকল্পে যুক্ত থাকায় আত্মীয়করণের মাধ্যমে অনিয়ম আরও বেড়েছে।
সরেজমিনে বড়গাছা ইউনিয়নের বিভিন্ন কেন্দ্র যেমন মালশন বড়পুকুরিয়া বাজার জামে মসজিদ, জয়সার জামে মসজিদ ও টংকুড়ি আমজাদ হোসেন টিয়ার কাচারি পরিদর্শনে দেখা যায়, অধিকাংশ কেন্দ্রে ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থীর পরিবর্তে মাত্র ১০-১৬ জন উপস্থিত রয়েছে। কোথাও জরাজীর্ণ ঘর, কোথাও মাটির বারান্দায় পাঠদান চলছে।
বড়পুকুরিয়া জামে মসজিদ কেন্দ্রের সভাপতির নাম কাগজে থাকলেও তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানা গেছে। জয়সার জামে মসজিদ কেন্দ্রের সভাপতি দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকলেও তার নামেই কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক কেন্দ্রে প্রকৃত শিক্ষা কার্যক্রম নেই, কোথাও আবার কেন্দ্রই অস্তিত্বহীন, তবুও কাগজে-কলমে চালু দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো কেন্দ্রে ৬০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী থাকলে সেটি বন্ধযোগ্য হলেও অনেক কেন্দ্র তা মানছে না।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো শিক্ষার্থীদের এনে হাজিরা খাতায় উপস্থিত দেখানো হয়। এভাবেই ভুয়া উপস্থিতি দেখিয়ে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে শিক্ষক কাজল রেখা বলেন, তিনি ২০১৪ সাল থেকে কর্মরত এবং বর্তমানে বাড়িতে পাঠদান করছেন। তবে এটি সাময়িক ব্যবস্থা বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে নুসরাত জাহান সূচির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মুসা বলেন, তিনি এ বিষয়ে অফিসে এসে কথা বলার জন্য অনুরোধ করেন।
নওগাঁ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক মো. মারুফ রায়হান বলেন, “কোনো অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাড়িতে কেন্দ্র পরিচালনার সুযোগ থাকলেও তা নির্ধারিত নিয়মে হতে হবে। অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. রাকিবুল হাসান বলেন, কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বিগত অর্থবছরে ৮৯টি কেন্দ্র যাচাই করে ৭৪টি কেন্দ্র সচল রাখা হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এই গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন