নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনির বিরুদ্ধে ওঠা মারধরের অভিযোগ ঘিরে যে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল, তদন্ত প্রক্রিয়ার অগ্রগতিতে তা এখন ভিন্ন বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে।
অভিযোগকারী আসাদুজ্জামান টুটুল নিজেই তার পূর্বের বক্তব্য থেকে সরে এসে ঘটনাটিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে উল্লেখ করায় পুরো ঘটনাটি নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকেলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) সাদিয়া আফরিনের সামনে দেওয়া বক্তব্যে টুটুল স্বীকার করেন যে, ভূমি অফিসের সামনে ভ্যানে মাইকিং করার পদ্ধতি তার ঠিক হয়নি।
তিনি বলেন, এভাবে জনসম্মুখে প্রচারণা চালানো অনুচিত ছিল। তবে একইসঙ্গে তিনি খাজনা আদায়ের বর্তমান প্রক্রিয়া নিয়ে তার আপত্তির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং সেটিকে ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে সংশোধনের দাবি জানান।
ঘটনার সূত্রপাত গত পহেলা এপ্রিল। ওইদিন আসাদুজ্জামান টুটুল ভূমি অফিসের গেটের সামনে ভ্যানে করে মাইকিং করেন এবং খাজনা আদায়ের প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ উত্থাপন করেন। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে তাকে ইউএনও কার্যালয়ে ডেকে পাঠানো হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তার বক্তব্য শুনে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা গ্রহণের উদ্দেশ্যেই তাকে ডাকা হয়েছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে কোনো ধরনের শারীরিক বা প্রশাসনিক হয়রানি ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পরপরই টুটুল ইউএনওর বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ উত্থাপন করেন, যা খুব দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযোগটি জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং প্রশাসনের ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরিস্থিতি স্বচ্ছভাবে তদন্তের জন্য প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
তবে তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্যেই অভিযোগকারী নিজের বক্তব্য পরিবর্তন করায় পুরো ঘটনাটি নাটকীয় মোড় নেয়। সাংবাদিকদের সামনে টুটুল বলেন, মারামারির ঘটনাটি আসলে ভুল বোঝাবুঝি। এভাবে মাইকিং করা ঠিক হয়নি। তার এই স্বীকারোক্তির ফলে পূর্বে উত্থাপিত অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় ফিরোজ, মাহবুব, জামিলসহ একটি বড় অংশ টুটুলের আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন।
তাদের দাবি, তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে অস্থিরতা সৃষ্টি করেন এবং পরে সেগুলো থেকে সরে দাঁড়ান। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, তার বেশিরভাগ অভিযোগেরই কোনো বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
পরিবারের সালমা ও ইভা নামে দুই সদস্যের বক্তব্য থেকেও জানা যায়, টুটুলের স্থায়ী বসবাস বা নির্দিষ্ট পেশাগত পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তার ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা নেই বলে তারা উল্লেখ করেছেন।
কোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহীনূর ইসলাম স্বপন বলেন, ‘এডিসি তদন্ত আসার খবরে আমি এখানে এসেছি। আপনাদের সবার সামনে ভুক্তভোগী টুটুল বললেন সবই ছিল ভুল বোঝাবুঝি।’
এদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি কেবল স্মারকলিপি গ্রহণের উদ্দেশ্যে টুটুলকে তার কার্যালয়ে ডেকেছিলেন। তিনি যে অভিযোগ তুলেছেন, তদন্ত চলছে। তদন্তে প্রকৃত সত্য উঠে আসবে।
তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাদিয়া আফরিনের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, তদন্ত প্রতিবেদন আমরা তৈরি করছি। কয়েক দিনের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।


