ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জিআই স্বীকৃতি পেল নেত্রকোনার ‎বালিশ মিষ্টি

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩১, ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
নেত্রকোনার ‎বালিশ মিষ্টি। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় বালিশ মিষ্টি দেশের ৫৮তম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। দীর্ঘ ১২০ বছরের ইতিহাস, স্বতন্ত্র স্বাদ ও নিজস্ব তৈরির প্রক্রিয়ার কারণে এই মিষ্টি শুধু নেত্রকোনার নয়; এখন পুরো বাংলাদেশের গর্বের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত হলো।

নেত্রকোনা শহরের বারহাট্টা রোডে প্রায় এক শতাব্দী আগে এই মিষ্টির যাত্রা শুরু হয়। স্থানীয় মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী গয়ানাথ ঘোষ প্রথম এই ব্যতিক্রমধর্মী মিষ্টি তৈরি করেন। তার হাত ধরেই জন্ম নেয় এমন এক স্বাদ, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। ১৯৬৫ সালে গয়ানাথ ঘোষ ভারতে চলে যাওয়ার আগে দোকানের দায়িত্ব তুলে দেন তার বিশ্বস্ত কর্মচারী নিখিল চন্দ্র মোদকের হাতে। নিখিল চন্দ্র মোদক ‘গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভান্ডার’ নাম অপরিবর্তিত রেখে ব্যবসা চালিয়ে যান এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বালিশ মিষ্টির ঐতিহ্য ধরে রাখেন।

ছোট বালিশের মতো আকৃতির হওয়ায় এই মিষ্টির নাম রাখা হয় বালিশ মিষ্টি। নামের সঙ্গে সঙ্গে এর আকৃতি ও স্বাদও ক্রেতাদের কাছে আলাদা এক আবেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি সন্দেশও নয়, আবার রসগোল্লাও নয়; বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের এক বিশেষ মিষ্টান্ন। খাঁটি দুধ, ছানা, চিনি ও ময়দার নিখুঁত সংমিশ্রণে তৈরি এই মিষ্টির স্বাদ একবার মুখে দিলেই আলাদা করে চেনা যায়।

‎বালিশ মিষ্টি তৈরির প্রক্রিয়াও অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও দক্ষতানির্ভর। দেশীয় গাভির দুধ থেকে ছানা তৈরি করে তাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ময়দা মিশিয়ে বানানো হয় মণ্ড। পরে সেটিকে বিশেষ কৌশলে ভেজে গরম চিনির রসে ডুবিয়ে রাখা হয়। শেষে ওপরে দেওয়া হয় ঘন ক্ষীরের প্রলেপ, যা মিষ্টিটিকে দেয় অতুলনীয় স্বাদ ও সৌন্দর্য। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কারিগরের অভিজ্ঞ হাতই বালিশ মিষ্টির আসল প্রাণ।

‎সময় বদলেছে, শহর বদলেছে, কিন্তু বালিশ মিষ্টির স্বাদ বদলায়নি—এই কথাই যেন বারবার প্রমাণ করে আসছে নেত্রকোনার এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যমে বালিশ মিষ্টি এখন আইনগতভাবেও নেত্রকোনার নিজস্ব পণ্য হিসেবে স্বীকৃত হলো, যা স্থানীয় কারিগর ও ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।

‎এই স্বীকৃতি শুধু একটি মিষ্টির নয়; এটি নেত্রকোনার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বালিশ মিষ্টি এখন আর শুধু স্বাদের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের গর্ব, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক অমূল্য ঐতিহ্য।