ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

পিরোজপুরে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন, লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা

নাছরুল্লাহ আল-কাফী, পিরোজপুর
প্রকাশিত: মার্চ ২৭, ২০২৬, ১১:১১ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

পিরোজপুর জেলার কচাঁ নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক মৎস্য বন্দর হচ্ছে পাড়েরহাট মৎস্য বন্দর। এ সামুদ্রিক মৎস্য বন্দরের পাশে চিতলিয়ার কচাঁ নদীর চরে গড়ে ওঠেছে শুঁটকি পল্লী। এখানে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি করা হচ্ছে ঢেলা, মরমা, ফ্যাপসা, কংকন, ছুরি, লইট্যা, চাপিলাসহ ৩৫ প্রজাতির মাছের শুঁটকি, যা স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। 

অন্যদিকে এই শুঁটকি পল্লীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান। এখানে পাশাপাশি প্রায় ৭টি শুঁটকি পল্লী রয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলার কচাঁ নদীর তীরে বাদুরা সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। এখানে সমুদ্র থেকে আহরণ করা মাছগুলো বিক্রি করা হয়। আর এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের পাশেরই চিথলিয়া গ্রামের নদীর চরে গড়ে উঠেছে শুঁটকি পল্লী। নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এই স্থানে তৈরি করা হয় ঢেলা, ফুটপোয়া, মরমা, বেঁজি, ফ্যাপসা, কংকন, ছুরি, লইট্যা, বাইন, চাপিলা, লাউক্য, হাইতাসহ প্রায় ৩৫ প্রজাতির মাছের শুঁটকি। এর মধ্যে লাউক্য ও হাইতা মাছের দাম সব থেকে বেশি। 

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

তারা আরও জানান, বর্তমানে শুঁটকি তৈরি মৌসুমের শেষ সময়েও চলছে চরম ব্যস্ততা। সকালে মৎস্য বন্দর থেকে সামুদ্রিক মাছ ক্রয় করে শুঁটকি পল্লীতে এনে মাছ কেটে ধুয়ে পরিস্কার করে রোধে শুকাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে শুঁটকি তৈরির কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা। এই পল্লীতে কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন প্রায় দেড়শতাধিক শ্রমিক। 

শুঁটকি ব্যবসায়ী আলি সরদার বলেন, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে একটি মাছের শুঁটকি তৈরি করতে ৫ থেকে ৮ দিন সময় লাগে। বিষ বা কোনো প্রকার রাসায়নিক পদার্থ ছাড়া তৈরি এ শুঁটকির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এখন থেকে প্রতি বছর প্রায় কোটি টাকার শুঁটকি আমরা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে থাকি। 

শুঁটকি ব্যবসায়ী ইমাম বেপারী বলেন, এখানে আমরা প্রায় ১৩ বছর ধরে শুঁটকি তৈরি করি। এখানকার শুঁটকিমাছ ৩ শত টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি বিক্রি হয়। আমাদের এ ব্যবসা চালিয়ে যেতে কষ্ট হয়। তবে আমাদের এই শুঁটকি পল্লীতে সরকারি কিছু সহযোগীতা পেলে এই অঞ্চলে শুঁটকির একটি বড় বাজার তৈরি করা সম্ভব। 

মো. সোহাগ খান নামে আরও এক ব্যবসায়ী বলেন, বঙ্গপসাগর থেকে ট্রলারে করে জেলেরা মাছ ধরে এনে এখানে বিএফডিসিতে বিক্রি করে। সেখান থেকে আমরা কিনে এনে ভালো করে ধুয়ে, রোদে শুঁকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে বাজারজাত করি। শুধু চিংড়ি মাছ বাদে সকল মাছ এখানে তৈরি করা হয়। এখানের মাছটা মিষ্টি পানির হওয়ায় খুব স্বাদ হয়। আমরা এখানে অনেক বছর ধরে এ ব্যবসা করি, কিন্তু কখনো সরকারি কোনো ঋণ আমরা পাইনি। সরকারের কোনো সাহায্য আমরা পাই না। 

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ব্যবসায়ী আকিজুল বেপারী বলেন, আমাদের এই শুঁটকি পল্লীতে সরকারের কাছে আমরা ঋণের জন্য বার বার দাবির করি; কিন্তু আমাদের ঋণ দিচ্ছে না, ঋণ দিলে আমরা আরও ভালো করে এ ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারব। এ ছাড়া সিজনের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টি হলে আমাদের এ ব্যবসায় অনেক ক্ষতি হয়। 

পিরোজপুর জেলা মৎস্য কর্মকতা সঞ্জীব সন্নামত বলেন, পিরোজপুরের শুঁটকি পল্লীর অনেক সম্ভাবনা রয়েছে এবং এখানে সঠিক ভাবে তদারকি করলে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে। এই শুঁটকি পল্লীতে শীত মৌসুমে ৯-১০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয়ে থাকে, এখন থেকে বছরে প্রায় কোটি টাকার শুঁটকি দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়ে থাকে। 

স্থানীয়রা মনে করছেন, সরকারি তদারকি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নত হলে এটি এই জেলার অন্যতম একটি কর্মসংস্থানের স্থান তৈরি হবে।