× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মো. শহিদুল ইসলাম, গাজীপুর

প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

ফুল-ফলের সৌরভে ইতিহাসের সাক্ষী ভাওয়াল রাজবাড়ির নাগলিঙ্গম

মো. শহিদুল ইসলাম, গাজীপুর

প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

গাছের কাণ্ডজুড়ে ঝুলছে অসংখ্য গোলাকার বাদামি ফল। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, যেন শত শত পাকা সফেদা ফল গাছের শরীরে সারি বেঁধে লেগে আছে। ফলের ফাঁক গলে ফুটে আছে দৃষ্টিনন্দন ফুল। পুরু পাপড়ির সেই ফুলের গড়ন আবার অনেকটা সাপের ফণা তোলা অবয়বের মতো। বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়লেও শতবর্ষী এই বৃক্ষটি আজও ফুল ও ফলে ভরপুর। প্রথম দেখায় যে কেউ ভাবতে পারেন, এ যেন প্রকৃতির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো চিরযৌবনা বৃক্ষ।

গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল রাজবাড়ি এলাকায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিরল বৃক্ষটির নাম নাগলিঙ্গম। প্রকৃতির সৌন্দর্য, ইতিহাসের গৌরব এবং রাজকীয় ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন হয়ে আজও এটি বহন করে চলেছে ভাওয়াল রাজাদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি।

প্রতিদিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নানা প্রয়োজনে আসা মানুষজন একবার হলেও থমকে দাঁড়ান গাছটির সামনে। কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন, কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়েন মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে। আবার কেউ ফুলের মাদকতাময় সুগন্ধে মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ কাটিয়ে দেন গাছের ছায়াতলে। বিশেষ করে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়জুড়ে গোলাপি, লাল ও হলুদের মিশেলে ফুটে থাকা নাগলিঙ্গম ফুল যেন পুরো রাজবাড়ি এলাকাকে রূপকথার মতো সাজিয়ে তোলে।

নাগলিঙ্গম গাছের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক এর ফুল ও ফলের বিন্যাস। কাণ্ড ফুঁড়ে বের হওয়া মোটা ডালের মতো অংশে থোকায় থোকায় ধরে বড় আকৃতির ফল। দেখতে অনেকটা বেলের মতো হওয়ায় অনেকে একে ‘ক্যানন ফল’ নামেও চেনেন। গাছের গোড়া থেকে শুরু করে পুরো কাণ্ডজুড়ে ঝুলতে থাকে অসংখ্য ফল। তার মাঝেই ফুটে থাকে সাপের ফণার মতো আকৃতির ফুল, যা অন্য যেকোনো ফুলের তুলনায় একেবারেই আলাদা।

ফুলের পাপড়িতে লাল, গোলাপি ও হলুদের অপূর্ব সমন্বয় যেমন নজর কাড়ে, তেমনি ফুলের মধ্যবর্তী অংশে নাগ বা সাপের ফণার মতো আকৃতি থাকায় এর নাম হয়েছে “নাগলিঙ্গম”। শুধু রূপেই নয়, সুগন্ধেও অনন্য এই ফুল। দূর থেকেই এর মনমাতানো সৌরভ টের পাওয়া যায়।

তবে নাগলিঙ্গম গাছের গুরুত্ব শুধু সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ভাওয়াল রাজাদের ইতিহাস ও স্মৃতি। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, ভাওয়াল রাজাদের সময় রাজবাড়িতে ১৪ থেকে ১৫টি হাতি ছিল। হাতিগুলোর নামও ছিল বেশ ব্যতিক্রম,গুন্ডা, ফুলমালা, রেবেকা ইত্যাদি। ভাওয়াল জমিদার বংশের রাজকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়ের সবচেয়ে প্রিয় ছিল ‘গুন্ডা’ নামের হাতিটি। কথিত আছে, হাতিগুলোর পেটে সমস্যা দেখা দিলে নাগলিঙ্গম গাছের ফল খাওয়ানো হতো, যা তাদের সুস্থ করে তুলত।

ভাওয়াল মির্জাপুর ডিগ্রি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন বলেন, এই গাছ খুব একটা দেখা যায় না। ভাওয়াল রাজারা তাদের পালিত হাতির অসুস্থতা দূর করতে নাগলিঙ্গমের ফল ব্যবহার করতেন বলে প্রচলিত রয়েছে। বর্তমানে গাছটি শুধু ইতিহাসের স্মারকই নয়, এটি এখনও মানুষকে দিচ্ছে মনোরম সুগন্ধ, শীতল ছায়া ও নির্মল সৌন্দর্য।

তিনি আরও বলেন, কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে ভাওয়াল রাজাদের ঐশ্বর্য। নেই সেই রাজকীয় হাতিশালা, নেই জমিদারি প্রথার জৌলুস। সময়ের স্রোতে বিলীন হয়েছে অসংখ্য স্মৃতি ও স্থাপনা। কিন্তু সব হারিয়েও রাজবাড়ির বুকে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই শতবর্ষী নাগলিঙ্গম গাছটি। যেন ইতিহাসের এক নীরব প্রহরী হয়ে অতীতের গৌরবগাথা শুনিয়ে যাচ্ছে নতুন প্রজন্মকে।

স্থানীয়দের মতে, দেশে এ ধরনের নাগলিঙ্গম গাছের সংখ্যা খুবই কম। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে ৫০টিরও কম নাগলিঙ্গম গাছ রয়েছে। সে হিসেবে গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ির এই গাছটি শুধু ঐতিহ্যের নিদর্শনই নয়, বিরল উদ্ভিদ হিসেবেও বহন করছে বিশেষ গুরুত্ব।

গাছটির বয়স সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হয়, এটি শত বছরেরও বেশি পুরোনো। বিশাল কাণ্ড, বিস্তৃত ডালপালা এবং কাণ্ডজুড়ে ফুল-ফলের সমারোহ দেখে প্রতিদিনই মুগ্ধ হন দর্শনার্থীরা। অনেকেই একে “প্রকৃতির বিস্ময়” বলেও অভিহিত করেন।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, ইতিহাসের আবেগ আর ঐতিহ্যের স্মৃতিকে একসূত্রে গেঁথে আজও ভাওয়াল রাজবাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে এই শতবর্ষী নাগলিঙ্গম। ফুলের সৌরভ আর ফলের বাহার নিয়ে এটি যেন প্রতিনিয়ত নতুন প্রজন্মকে শুনিয়ে যাচ্ছে হারিয়ে যাওয়া ভাওয়াল রাজাদের গৌরবময় ইতিহাস।

Link copied!