ঢাকা শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

আগের মতো নেই হকারদের হাঁকডাক

যাত্রী সংকটে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট

ফয়সাল আহমেদ, রাজবাড়ী
প্রকাশিত: নভেম্বর ২৯, ২০২৫, ০৫:৫০ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর বদলে গেছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাটের চিত্র। যাত্রী সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে ঘাটকেন্দ্রিক জীবিকা। কমে গেছে পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নৌযান চলাচল।

ফলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ঘাটের সঙ্গে যুক্ত হাজারো শ্রমিক, হকার, রিকশাচালক, হোটেল–রেস্তোরাঁ মালিকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা।

২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়। সময় কমেছে, ভোগান্তি কমেছে, বেড়েছে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের গতি।

কিন্তু এই উন্নয়নের আড়ালে থমকে গেছে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটের চারপাশে গড়ে ওঠা হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা।

এক সময় এই নৌপথ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রাণকেন্দ্র ছিল। দৌলতদিয়া ঘাটে ৫-৭ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট ছিল নিয়মিত ঘটনা। যাত্রী আর ট্রাকচালকের ভিড়ে ব্যস্ত থাকত হোটেল-রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল, দোকান, চা-স্টল ও শত শত হকারের পসরা। দিন-রাত কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত দুই ঘাট।

পদ্মা সেতু চালুর আগে প্রতিদিন ৫ হাজারের বেশি যানবাহন দৌলতদিয়া প্রান্ত দিয়ে পারাপার হতো। তখন ১৮-২০টি ফেরি নিয়মিত চলাচল করত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো।

বিআইডব্লিউটিসির ঘাট শাখার ব্যবস্থাপক মো. সালাউদ্দিন বলেন,‘এখন সব ফেরি সচল থাকলেও গাড়ির জন্য ফেরিকে অপেক্ষায় থাকতে হয়। ঘাটে আগের মতো সিরিয়ালের দৃশ্য আর নেই।’

বর্তমানে উভয় ঘাট মিলে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪ হাজার যানবাহন পারাপার হচ্ছে, যা আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

এক সময় দিনে ১২-১৫ হাজার যাত্রী পারাপার হতো দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া লঞ্চঘাট দিয়ে। ভিড়ে জায়গা পেত না লাল পোশাকধারী কুলি, হকারদেরও যথেষ্ট জায়গা মিলত না। কিন্তু এখন লঞ্চঘাট পুরোপুরি যাত্রীশূন্য। নেই কোলাহল, নেই হকারদের ডাক, নেই যাত্রীদের ভিড়।

দৌলতদিয়া লঞ্চঘাটের ম্যানেজার মো. নুরুল আনোয়ার মিলন বলেন, ‘এক সময় ২২টি লঞ্চ দিয়েও যাত্রী সামলানো যেত না। এখন প্রতিদিন সর্বোচ্চ দেড় হাজার যাত্রী পারাপার হয়। বেশিরভাগ লঞ্চ বসে থাকে অলসভাবে।’

পদ্মা সেতু চালুর পর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। শত শত দোকান এখন খালি পড়ে আছে।

ব্যবসায়ী শহিদুল মিয়া বলেন, ‘আগে লাখ টাকার বেচাকেনা হতো। এখন খরচও উঠছে না। আমাদের মতো অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছি।’

চা বিক্রেতা সাকাত হোসেন বলেন, ‘আগে দিনে হাজার কাপ চা বিক্রি হতো। এখন ১০০ কাপও হয় না। দোকান বন্ধের চিন্তা করছি।’

গোয়ালন্দের সংবাদপত্র এজেন্ট রেজাউল করিম বলেন, ‘আগে প্রতিদিন হাজারখানেক পত্রিকা বিক্রি হতো। এখন তার চার ভাগের এক ভাগও বিক্রি হয় না।‘

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন,‘নতুন প্রজন্ম কল্পনাই করতে পারবে না দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট কতটা ব্যস্ত ছিল। এটি শুধু যাতায়াতের পথ ছিল না, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণ।’

এক সময়কার কোলাহলমুখর ঘাট এখন নিস্তব্ধ। ফেরি ও লঞ্চের শব্দের জায়গায় এসেছে নির্জনতা।

ঘাটকর্মী সাদেকুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, ‘পদ্মা সেতুতে রেল চালুর পর থেকে ফেরিঘাট আরও অচল হয়ে গেছে। লঞ্চঘাট তো প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে।’

পদ্মা সেতু সময় বাঁচাল, মানুষের স্বপ্ন পূরণ করল। কিন্তু সেই উন্নয়ন ছুঁয়েছে না দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটকেন্দ্রিক হাজারো মানুষের জীবন।

জীবিকা হারিয়ে অন্ধকারে দিন কাটছে তাদের। এক সময়কার দেশের অন্যতম ব্যস্ততম নৌপথ এখন ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে, আর স্মৃতি হয়ে থাকছে ঘাটের জৌলুশময় দিনগুলো।