রাজশাহীর তানোরে গভীর রাতে বাড়ির মূল দরজার গেটে শিকল তুলে পেট্রোল দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। আগুনে ৫ পরিবারের বসতবাড়ি, আসবাবপত্র ও ১৫ লাখ টাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার দিকে উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের ইলামদহী গ্রামে আগুন লাগার ঘটনাটি ঘটে।
এ ঘটনায় দুজন মহিলা আহত হন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয়রা। প্রতিবেশী ও ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও তার আগে ৫ পরিবারের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে পড়ে। থামছে না কান্না ও আহাজারি।
ইলামদহী গ্রামের রাসেল নামের এক ব্যক্তি জানান, গভীর রাতে বাড়ির বাইরের দরজায় শিকল দেওয়া হয়। শিকল দেওয়ার পর পেট্রোল দিয়ে দুর্বৃত্তরা বাড়ির লোকজনকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে আগুন দেয়। আগুনের লেলিহান শিখা দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। এ সময় বাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা ফেরদৌসী আগুন দেখতে পেয়ে ‘আগুন, আগুন’ বলে চিৎকার শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যেই আশপাশের বাড়িতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফেরদৌসীর নগদ ১৫ লাখ টাকা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ ছাড়াও তার বোন বিলকিসের বাড়ি, মোজাম্মেল ও তার ভাই নুর ইসলামের বাড়ির সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
তিনি আরও জানান, ফেরদৌসীর মেয়ে নাসিমার কপাল পুড়ে গেছে। তার বাড়ির সবকিছু পুড়েছে। ফেরদৌসীর কলেজপড়ুয়া মেয়েকে জানালা ভেঙে বের করা হয়। তার শরীরের কিছু অংশ পুড়েছে।
নাসিমার স্বামী সিরাজুল জানান, আগুন সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। জীবনের কষ্টে অর্জিত সবকিছু নিমিষেই শেষ হয়ে গেছে। আমার স্ত্রী ও শালিকার শরীরের কিছু অংশ পুড়েছে। তাদের হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে নেওয়া হয়েছে। পাঁচ পরিবারের ঘরে থাকা ধান-চালসহ এমন কোনো জিনিস নেই যা পুড়েনি।
ইউপি জামায়াতের আমির জুয়েল জানান, ফজরের নামাজ পড়তে উঠে চিৎকার-হইচই শুনতে পাই। কাছে গিয়ে দেখি পাঁচ পরিবারের বসতবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
পাঁচন্দর ইউপির ৩ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য সাদিকুল ইসলাম জানান, পাঁচ পরিবারের কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। গভীর রাতে আগুন দেওয়া মানে পুড়িয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা সবাইকে জীবিত রেখেছেন। তাদের দ্রুত সরকারি সহযোগিতা দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। কারণ তাদের কাছে কিছুই নেই।
ক্ষতিগ্রস্তরা কোনো ধরনের কথা বলতে পারছেন না। শুধু হাউমাউ করে কান্না করছেন এবং বলছেন, সব শেষ হয়ে গেছে। এখন কী খাবেন, কোথায় থাকবেন।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা মমিনুল হক মমিন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পরিদর্শন করে পরিবারগুলোকে সান্ত্বনা দেন। তিনি জানান, এটি অমানবিক ঘটনা। তবে কেউ হতাহত হয়নি, এটিই মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।
পাঁচন্দর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ক্ষতির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সরকারি সহযোগিতা পেলে তা তাদের দেওয়া হবে।
তানোর ফায়ার সার্ভিস জানায়, কে বা কারা আগুন লাগিয়েছে তা জানা যায়নি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই সবকিছু পুড়ে গেছে। নগদ ১৫ লাখ টাকাসহ প্রাথমিকভাবে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ টাকা।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আল মামুন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতি পরিবারকে দুই বান্ডিল করে টিন ও ৬ হাজার টাকা করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সহযোগিতা করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খানের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



