নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, যৌন নির্যাতন এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কেবল কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সামাজিকভাবে বর্জনের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তবেই একটি মানবিক, সভ্য ও উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকালে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের ওপর ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনাগুলো সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনার পর শুধু সাধারণ মানুষই নয়, প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও নিজেদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সংকোচ বা ভয় থেকে ভুক্তভোগী পরিবার বিচার চাইতে পিছিয়ে যায়, যা অপরাধীদের উৎসাহিত করে। তবে সরকার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন, মানবপাচার এবং অ্যাসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধে দেশে কঠোর আইন রয়েছে। কিন্তু শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা কঠোর আইন ও জনসচেতনতার কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। একইভাবে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধেও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং অপরাধীদের সমাজে কোনো ধরনের গ্রহণযোগ্যতা দেওয়া যাবে না।
কাজী শহিদুল ইসলাম আরও বলেন, যৌথ পরিবারের পরিবর্তে একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ায় শিশুদের যথাযথ তদারকি অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি স্মার্টফোন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার, অনলাইন আসক্তি এবং মাদকের বিস্তার শিশু-কিশোরদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তাই অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও মানসিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে।
তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা গোপন না করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো প্রয়োজন। সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে অপরাধ আড়াল করলে অপরাধীরাই শেষ পর্যন্ত সুবিধা পায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহা. সবুর আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান এবং ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ারুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক ইসরাত জাহান। অনুষ্ঠানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
এর আগে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা সপ্তাহ উপলক্ষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে একই স্থানে এসে শেষ হয়। পরে বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন জেলা প্রশাসক।

