রাঙামাটির বাঘাইছড়ি পৌরসভার ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাচালং বাজার থেকে লাইল্যাঘোনা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার ‘GOV Maintenance’ প্রকল্পের আওতায় সড়কটির কাজ বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
উপজেলা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী মো. সাজু আহমেদ মুঠোফোনে জানান, ‘মেসার্স আয়ান এন্টারপ্রাইজ’ নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রকল্পটির কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কাজটি করছেন বাঘাইছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি, উপজেলা বিজয় টিভির প্রতিনিধি ও উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ঠিকাদার আব্দুল মাবুদ এবং উপজেলা বিএনপির সদস্য মো. আতাউর রহমান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের গার্ডওয়াল নির্মাণে নিম্নমানের ইট, সিমেন্ট, রড ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুপাতে সিমেন্ট ব্যবহার না করে দায়সারা কাজ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। গার্ডওয়ালের ইট হাত দিয়ে টান দিলেই উঠে যাচ্ছে বলে দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে গার্ডওয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে, যা মানসম্মত নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এদিকে সড়কের কার্পেটিং কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কাজের নিয়ম অনুযায়ী যেখানে ১৫ মিলিমিটার পুরুত্ব থাকার কথা, সেখানে বাস্তবে ৭ থেকে ৮ মিলিমিটার কার্পেটিং দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ হওয়ার তিন থেকে চার দিনের মধ্যে হাত দিয়ে টান দিলেই তা উঠে যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে কাজের স্থায়িত্ব ও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অপরদিকে প্রকল্প এলাকায় কোনো সতর্কতামূলক বা কর্তৃপক্ষের সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। রাস্তার ওপরের বালু ও ময়লা যথাযথভাবে অপসারণ না করেই তার ওপর বিটুমিন ঢেলে দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এভাবে কাজ হলে বর্ষায় আবার গর্ত হবে, কার্পেটিং উঠে যাবে। শেষ পর্যন্ত ভোগান্তি পোহাতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
কাজ চলাকালে এলজিইডির কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীকে সরেজমিনে পাওয়া যায়নি। ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্টের সঙ্গে কথা বলে প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে তার কাছে কোনো এস্টিমেট কপি পাওয়া যায়নি।
তিনি দাবি করেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজ চলছে এবং এতে কোনো অনিয়ম নেই। তবে অভিযোগের নির্দিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরা হলে তিনি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন প্রেসক্লাব সভাপতি ও সাংবাদিক ঠিকাদার আব্দুল মাবুদের ভাগিনা এবং বাঘাইছড়ি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নুর উদ্দিন রাজু।
তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, এখানে কী সমস্যা হয়েছে? এটা কি আপনাদের এলাকা? আপনারা কে? আপনারা কি উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার নাকি থানা ইঞ্জিনিয়ার?
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে আর কথা বললে আমার চোখের পর্দা উল্টে যাবে, তখন অনেক সমস্যা হয়ে যাবে। এ বক্তব্যকে সাংবাদিকদের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, নুর উদ্দিন রাজু অশোভন আচরণ করেন এবং সাংবাদিকদের ‘চাঁদাবাজি’ করতে আসার অভিযোগ তোলেন। এমনকি উপস্থিত শ্রমিকদেরও ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রশ্ন তুললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন।
সাংবাদিকদের দাবি, এ সংক্রান্ত অডিও রেকর্ড তাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্পটির কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। প্রেসক্লাব সভাপতির দায়িত্বে থাকায় এবং রাজনৈতিক প্রভাব থাকার কারণে আব্দুল মাবুদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে তুলতে অনেকেই সাহস পাচ্ছেন না।
এ ছাড়া বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে তিনি ঠিকাদারি ও সাংবাদিকতা চালিয়ে গেছেন এমন অভিযোগও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে।
সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ বুঝে নেওয়ার পরই বিল প্রদান করা হবে। কাজে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে ঠিকাদারের লাইসেন্স কালো তালিকাভুক্ত করা হবে এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করা হবে।
অন্যদিকে, উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. সাজু আহমেদ বলেন, স্থানীয় সাংবাদিকরা সরেজমিনে গিয়েছেন, এতে সমস্যা নেই। তবে যাওয়ার আগে তাকে জানানো হয়নি। তার দৃষ্টিতে কাজের মান ঠিক আছে এবং বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।
প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, কাজের গুণগত মান যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি ইতোমধ্যে পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের কাছেও পৌঁছেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন