সাতক্ষীরার সদর হাসপাতালে কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আহত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও জলাতঙ্ক প্রতিরোধী অ্যান্টিরেবিস ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন রোগীরা। প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ রোগী কুকুর বা বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এলেও প্রতিষেধক না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
সদর হাসপাতালের জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা রোগীরা ভ্যাকসিন না পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ একাধিক দিন এসেও ভ্যাকসিন না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ফার্মেসি মালিক ভ্যাকসিনের দাম দ্বিগুণ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিষেধক সংকটের কারণে গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে সরকারি সেবার ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীরা বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সামলাতে না পেরে অনেকেই ভ্যাকসিন নেওয়া থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন, যা তাদের জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই সংকটকে পুঁজি করে হাসপাতালসংলগ্ন ও বিভিন্ন এলাকার কিছু অসাধু ফার্মেসি মালিক ভ্যাকসিনের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন। যেখানে সরকারি নির্ধারিত মূল্য ৪৫০ টাকা, সেখানে একই ভ্যাকসিন ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, এমনকি কোথাও এক হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষের আর্থিক ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে, অন্যদিকে প্রাণঘাতী জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলার কলারোয়া উপজেলার পাঁচনল গ্রামের কুকুরের কামড়ে আহত সাকিবুল হাসান (১৭) ও জয়নগরের আজিজুল গাজী (৪৫) জানান, বাইরে ভ্যাকসিনের অতিরিক্ত দাম তাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। একই অভিযোগ করেন বিড়ালের আঁচড়ে আহত শিশু প্রিয়াঙ্কা (৮) ও শরিফা খাতুন (২৫)।
চিকিৎসকদের মতে, ভ্যাকসিন সংকটের এই সময়ে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে কোনো প্রাণী কামড় বা আঁচড় দিলে সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষতস্থান অন্তত ১৫ মিনিট ধরে সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুতে হবে। এরপর যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা অন্য সরকারি হাসপাতাল থেকে ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে হবে। সামর্থ্য থাকলে অনুমোদিত ফার্মেসি থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে অবশ্যই প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে প্রয়োগ করানো জরুরি।
পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধে সরকারি পর্যায়ে দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করা, পথকুকুর নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মানস কুমার বলেন, জলাতঙ্ক একটি নিশ্চিত প্রাণঘাতী রোগ। কামড়ের পর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভ্যাকসিন না নিলে মৃত্যুঝুঁকি অনিবার্য। তাই ভ্যাকসিন সংকট থাকলেও রোগীকে চার থেকে পাঁচ ডোজের পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করতেই হবে।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম জানান, গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে ভ্যাকসিনের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।



