সাতক্ষীরা উপকূল সংলগ্ন সুন্দরবন এলাকায় চাষ হওয়া নরম খোলসের (সফটশেল) কাঁকড়া আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা পাওয়ায় জেলার অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। উচ্চমূল্যে রপ্তানি হওয়ায় এ খাত এখন সাতক্ষীরার হাজারো মানুষের জীবিকার প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সফটশেল কাঁকড়ার দাম বেশি হওয়ায় অনেক চাষি চিংড়ি চাষ ছেড়ে কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছেন। লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছর নতুন নতুন খামার গড়ে উঠছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, শ্যামনগর, কালীগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলায় প্রায় ৪২০ হেক্টর জমিতে কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮০০ টন। শুধু শ্যামনগরেই রয়েছে ১ হাজার ১৯৫টি ঘের, যার মধ্যে ৮৭০টি নরম খোলসের কাঁকড়ার। গত বছর এখানে ১ হাজার ৬৮০ টন কাঁকড়া উৎপাদিত হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাতক্ষীরা থেকে ৫৬৭ টন কাঁকড়া রপ্তানি করে আয় হয়েছিল ৬৭ লাখ মার্কিন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি ৮০০ টন ছাড়ায়। তবে বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় পরের বছর তা কমে ৬২২ টনে নেমে আসে, যার মূল্য ছিল ৮৭ লাখ ডলার।
উপকূলবর্তী দাতিনাখালী, অর্পণগাছিয়া, বুড়িগোয়ালিনী ও মুন্সীগঞ্জ গ্রামজুড়ে এখন ভাসমান প্লাস্টিকের খাঁচায় কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। কাঁকড়া সংগ্রহ, পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অনেক বেকার তরুণ স্বল্প পুঁজিতে এই খাতে যুক্ত হচ্ছেন। বর্তমানে জেলায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে কাঁকড়া চাষের ওপর নির্ভরশীল।

২০১৪ সালে যেখানে শ্যামনগরে মাত্র ১০টি বাণিজ্যিক ঘের ছিল, বর্তমানে সেখানে প্রায় ২২০ হেক্টর জমিতে ৮৭০টির মতো ঘের রয়েছে। নরম খোলসের কাঁকড়া সাধারণত খাঁচা পদ্ধতিতে চাষ হয়। পানির ওপরের স্তরে খাঁচা বসিয়ে নিচের স্তরে রুই, কাতলা, তেলাপিয়াসহ সাদা মাছ চাষ করে পুকুরের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করছেন চাষিরা।
বর্তমানে সফটশেল কাঁকড়া চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন এশীয় দেশে রপ্তানি হচ্ছে। দ্রুত প্রক্রিয়াজাত ও রান্না করা যায় বলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বেশি।
সুন্দরবনের কাছে ‘ভাই ভাই অ্যাগ্রো ক্র্যাব ফিশারিজ’-এর মালিক বিশ্বনাথ মণ্ডল জানান, ২০১৭ সালে ২০ বিঘা জমিতে চাষ শুরু করে এখন তার ৫৫ হাজার খাঁচা রয়েছে। ১০০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়াকে ১৮-২০ দিন তেলাপিয়া খাইয়ে ১৫০ গ্রাম হলে রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি করা হয়। তার খামারে ২৫ জন স্থায়ী কর্মী কাজ করছেন।
তবে পোনা বা ক্র্যাব সিডের সংকট এ শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ। সুন্দরবনে প্রবেশে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা থাকায় বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পোনা সংগ্রহ বন্ধ থাকে। এ ছাড়া লার্ভার মৃত্যুহার বেশি হওয়ায় পোনার প্রাপ্যতা কমে গেছে। ফলে দাম কয়েকগুণ বেড়েছে।
শ্যামনগর সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌহিদ হাসান বলেন, দেশের মোট সফটশেল কাঁকড়া উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ শ্যামনগর থেকে আসে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, চিংড়ির পর কাঁকড়া এখন জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য। উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চাষিদের আধুনিক ও টেকসই পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পোনা সংকট মোকাবিলায় সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানো হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টেকসই ব্যবস্থাপনা ও পোনা সংকট সমাধান করা গেলে সাতক্ষীরার সফটশেল কাঁকড়া শিল্প দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।


-20260223122436.webp)

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন