শেরপুরের নকলা উপজেলাতে চলতি রবি মৌসুমে মরিচ চাষে সাফল্যের মুখ দেখছেন কৃষকেরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্ধারিত ৩৪৪ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে ৩৪০ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রায় শতভাগ অর্জন। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো উপকরণ সরবরাহ এবং কৃষকদের আগ্রহ—এই তিনের সমন্বয়েই এসেছে এমন সাফল্য। মাঠজুড়ে লাল-সবুজ মরিচের সমারোহে কৃষকের মুখে ফুটেছে হাসি।
উচ্চ ফলনশীল জাতের প্রতি ঝোঁক
এ বছর উপজেলায় বিজলি, বিজলি প্লাস ও বালিঝুরি জাতের মরিচ বেশি চাষ হয়েছে। স্বল্প সময়ে ফলন, তুলনামূলক কম রোগবালাই এবং বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় এসব জাত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিজলি ও বিজলি প্লাসের রং, আকার ও ঝালমাত্রা ক্রেতাদের কাছে সমাদৃত।
প্রদর্শনী প্লট ও প্রযুক্তি সহায়তা
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মরিচ চাষ সম্প্রসারণ ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে বিভিন্ন এলাকায় ২২টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি প্লটের আয়তন ৩৩ শতক। নির্বাচিত কৃষকদের উন্নতমানের বীজ, রাসায়নিক ও জৈব সার এবং প্রয়োজনীয় বালাইনাশক সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকি চলছে। উন্নত জাত ব্যবহারে উৎপাদন খরচ কমে এবং ফলন বাড়ে—ফলে লাভের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রদর্শনী প্লট দেখে অন্য কৃষকেরাও আধুনিক পদ্ধতিতে চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। ফলন ভালো ও বাজারমূল্য সন্তোষজনক হওয়ায় আগ্রহ বেড়েছে কয়েক গুণ।
ইউনিয়নভিত্তিক চাষের চিত্র
উপজেলার উরফা, বানেশ্বরদী, পাঠাকাটা, চরঅষ্টধর ও চন্দ্রকোনা ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি মরিচ চাষ হয়েছে। এসব এলাকার মাটি ও আবহাওয়া মরিচের জন্য উপযোগী হওয়ায় আবাদ বেড়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলে মরিচের ক্ষেত চোখে পড়ছে বেশি।
উরফা ইউনিয়নের কোদালজা বাজার এলাকার কৃষক নুর ইসলাম জানান, ২০ শতক জমিতে দেশীয় জাতের মরিচ চাষে তাঁর এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাকা। মোট খরচ দাঁড়াতে পারে ১৪–১৫ হাজার টাকা। এ জমি থেকে ৪–৫ মণ শুকনা মরিচ পাওয়ার আশা করছেন তিনি। বাজারদর অনুযায়ী আয় হতে পারে ৪০–৫০ হাজার টাকা।
একই এলাকার আরও কয়েকজন কৃষক ১০ থেকে ৩০ শতক জমিতে বিভিন্ন জাতের মরিচ চাষ করেছেন। তাঁদের দাবি, নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও অতিরিক্ত মরিচ বিক্রি করে বাড়তি আয় সম্ভব হচ্ছে। স্বল্প সময়ে নগদ অর্থ পাওয়ায় অনেকেই ধান বা অন্য ফসলের পরিবর্তে মরিচ চাষে ঝুঁকছেন।
কৃষি বিভাগের আশাবাদ
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান বলেন, স্বল্প মেয়াদি এ মসলা জাতীয় ফসল চাষে কৃষকেরা কয়েক বছর ধরেই লাভবান হচ্ছেন। সঠিক পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এবং বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ তাবাসসুম মকবুলা দিশা জানান, প্রদর্শনী প্লটগুলোতে ইতোমধ্যে ভালো ফলনের আভাস মিলেছে।
কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, নকলায় মরিচ চাষের এ অগ্রগতি শুধু কৃষকের আয় বৃদ্ধি নয়, উপজেলার সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সঠিক বাজারব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে আগামী মৌসুমে আবাদ আরও বাড়বে। কৃষক ও কৃষি বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় মরিচ চাষ নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

