সরকারি বদলির আদেশ অমান্য করে আগের কর্মস্থলেই বহাল রয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামাল আহমেদ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে তিনি গণভোট এবং নতুন কাউকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি এমন অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বদলির আদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু ডা. কামাল আহমেদ তা মানছেন না। বরং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তিনি পীরগঞ্জেই অবস্থান করছেন।
স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি নির্দেশ অমান্য করেও একজন কর্মকর্তা কীভাবে দায়িত্বে বহাল থাকেন। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হলেও এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, জানা গেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ বি এম আবু হানিফ স্বাক্ষরিত ১২ জানুয়ারির আদেশে ডা. কামাল আহমেদকে পার্শ্ববর্তী উপজেলা রানীশংকৈল স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পদে বদলি করা হয়। আদেশে বলা হয়েছিল, পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর না করলে ষষ্ঠ কর্মদিবসে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবমুক্ত বলে গণ্য হবেন।
তবে আদেশ জারির এক সপ্তাহ পার হলেও মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) পর্যন্ত তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। বরং পীরগঞ্জেই অবস্থান করে নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যা সরকারি বিধি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের মধ্যে পড়ে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাড়ি ও কর্মস্থল পীরগঞ্জে হওয়ায় ডা. কামাল আহমেদ নিজ বাড়িতে ‘কেয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অফিস সময়েই ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হয়। এ ছাড়া হাসপাতালের অন্যান্য চিকিৎসক ও কর্মচারীরা রোগীদের সেখানে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক আচরণ করা হয়।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ডা. কামালের ‘অন্যায় নির্দেশ’ মানতে অস্বীকৃতি জানানোয় হাসপাতালের পরিসংখ্যানবিদ আরমিনা আকতারকে গত ১ ডিসেম্বর হয়রানিমূলক বদলি করা হয়। পরে ২৩ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য বিভাগ সেই বদলির আদেশ বাতিল করে তাকে আগের কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেয়। তবে নির্দেশ পাওয়ার পরও ডা. কামাল আহমেদ তার যোগদানপত্র গ্রহণ করেননি। ফলে আরমিনা আকতার সিভিল সার্জন কার্যালয় ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঘুরেও কাজে যোগ দিতে পারছেন না।
অন্যদিকে, ডা. কামাল আহমেদের বিরুদ্ধে অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ না হয়েও প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি ও অনুমোদনহীন ক্লিনিকে সিজারসহ অপারেশন কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসক মহল ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ডা. কামাল আহমেদ বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দেওয়া কিছু দায়িত্ব এখনো চলমান রয়েছে। সেসব দায়িত্ব পালন করতেই আমি বর্তমানে কর্মস্থলে অবস্থান করছি। আমার ওপর অর্পিত কাজগুলো শেষ হলে আমি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেব। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত নেই। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি আমাকে গণভোট সংক্রান্ত কোনো দায়িত্ব দেন, সেটিও আমাকে পালন করতে হবে। এটি আমার চাকরিরই একটি অংশ। তবে যেকোনো সময় আমি চলে যাব।’
পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. তাছবীর হোসেন বলেন, ‘কারণ সরকারি কর্মকর্তারা বর্তমানে ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত। স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বদলির আদেশপত্রেও ভোট-সংক্রান্ত দায়িত্ব থাকলে পরবর্তী সময়ে যোগদানের সুযোগ রাখা হয়েছে। ডা. কামাল আহমেদ গণভোটের প্রচার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে রয়েছেন। তাই হয়তো তিনি এখনো নতুন কর্মস্থলে যেতে পারেননি। নতুন কেউ এলে তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর করে চলে যাবেন।’
ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা. আনিসুর রহমান বলেন, ‘বদলির আদেশ বাস্তবায়ন করা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জন্য বাধ্যতামূলক। তবে কোনো কর্মকর্তা নির্বাচন বা গণভোট সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী বিষয়টি সমন্বয় করা হয়। খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ইসরাত ফারজানা বলেন, ‘বদলির আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। নির্বাচন বা গণভোট সংশ্লিষ্ট কোনো দায়িত্ব থাকলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার দুপুরে ডা. কামাল আহমেদ তার গ্রামের আত্মীয় পরিজন, বন্ধু-বান্ধব এবং কিছুসংখ্যক ভাড়াটিয়া লোকজনকে টাকার বিনিময়ে হাসপাতালে নিয়ে এসে তাকে পূর্বের কর্মস্থলে রাখার দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।



