ঠাকুরগাঁও জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের মধ্যে ঠাকুরগাঁও-১ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে এ আসনে অনেক আগে থেকেই প্রচার শুরু হয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থীরা দলবেঁধে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন; করছেন পথসভা, হাটসভা ও খোলা বৈঠক। দিচ্ছেন নানা উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান ও নারীদের উন্নয়নে তুলে ধরছেন বিভিন্ন পরিকল্পনা। প্রতিপক্ষের প্রার্থীদের উদ্দেশে চলছে আক্রমণাত্মক বক্তব্যও। পাশাপাশি দলীয় কর্মী বাহিনীও বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের পদচারণায় সরব হয়ে উঠেছে ঠাকুরগাঁওয়ের ভোটের মাঠ।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার তিনটি থানা, ২১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসন। এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৪ হাজার ৮৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫১ হাজার ১৯৬ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৮ জন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর বদলে যায় এখানকার রাজনৈতিক চিত্র। অতীতের প্রতিটি নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির ত্রিমুখী লড়াই দেখা গেলেও আসন্ন নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। এ ছাড়া কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন—ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের পরিচিত ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ এবং বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকা সাবেক ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগর শূরা সদস্য দেলাওয়ার হোসেন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী ডা. হাফেজ মো. খাদেমুল ইসলাম।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ আসনে একাধিকবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রী ও বিমান প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পান। কৃষি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘উত্তর বাংলাদেশ গভীর নলকূপ’ প্রকল্পটি বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটান। এতে ভুট্টা, আলু ও গমসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে অঞ্চলটি। যদিও বিমান প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে তিনি পরিত্যক্ত ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরটি চালু করতে সক্ষম হননি।
প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। প্রতিদিন একাধিক স্থানে পথসভা, খোলা বৈঠক ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা এবং স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে ভোট চাইছেন। তিনি ৫ আগস্ট-পরবর্তী হামলা ও মামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে সম্প্রীতির ঠাকুরগাঁও গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। অতীতে প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে এলাকার উন্নয়নে তার ভূমিকার কথা তুলে ধরে ভবিষ্যতে মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিজেড স্থাপন এবং পরিত্যক্ত বিমানবন্দর চালুর প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন।
আসন্ন নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের মূল লক্ষ্য আওয়ামী লীগ ও সনাতনী ভোটব্যাংক। এ কারণে তিনি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় বেশি বেশি সভা-সমাবেশ করছেন এবং হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার অনুকম্পা আদায়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। আওয়ামী লীগের নিরপরাধ কর্মী-সমর্থকদের বুকে টেনে নেওয়ার ঘোষণা এবং সনাতনীদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা নির্বাচনি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কিছু নেতাকর্মীর নিপীড়ন, নির্যাতন ও মামলা-বাণিজ্য তার জন্য নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে কাজ করছে।
অন্যদিকে, জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন নতুন মুখ হিসেবে মাঠে নেমেছেন। তিনিও সক্রিয়ভাবে নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে মাঠ গরম করে তুলেছেন। বিএনপি মহাসচিব যেখানে জামায়াতের অতীত কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বক্তব্য দিচ্ছেন, সেখানে দেলাওয়ার হোসেন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজাকার তালিকা ও বিএনপির মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে পাল্টা আক্রমণ করছেন। তিনিও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় প্রচার চালিয়ে ৫ আগস্টের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের জন্য প্রতিপক্ষকে দায়ী করে ভোটারদের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছেন। ক্ষমতায় এলে লুণ্ঠিত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন।
এ ছাড়া তিনি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার এমপিওভুক্তি, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, ইপিজেড নির্মাণ এবং দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার তুলে ধরে ভোট চাইছেন। রাজনীতির সহিংসতার বাইরে থাকা শান্তিপ্রিয় সাধারণ ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতকে বিকল্প শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ডা. খাদেমুল ইসলামের প্রচার তুলনামূলকভাবে অনেকটাই দুর্বল। শহর ও গ্রামের মোড়ে মোড়ে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের ব্যানার চোখে পড়লেও হাতপাখা প্রতীকের পক্ষে তেমন কোনো ব্যানার বা লিফলেট দেখা যাচ্ছে না। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের মিছিল ও স্লোগান শোনা গেলেও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর পক্ষে তেমন কোনো কার্যক্রম নজরে পড়ছে না।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক ও সনাতনী ভোটই হয়ে উঠেছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নির্বাচনি সমীকরণ পাল্টে দেওয়ার প্রধান অনুষদ। ইতোমধ্যে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে বিএনপি মহাসচিব আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে সনাতনী ভোটের একটি অংশে প্রভাব বিস্তার করেছেন জামায়াত প্রার্থী। ফলে আসন্ন নির্বাচনে এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



