ঠাকুরগাঁও জেলার একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান ঠাকুরগাঁও চিনিকল কাঁচামাল সংকট ও পুরোনো যন্ত্রপাতির চাপে ধুঁকছে। আশপাশের পঞ্চগড় চিনিকল ও সেতাবগঞ্জ চিনিকল কয়েক বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
চিনিকলগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে আখ সংকট, পুরাতন যন্ত্রপাতি, চিনি অবিক্রীত থাকা, শ্রমিকদের বেতন বকেয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও নীতিগত দুর্বলতা বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এসব সমস্যা ঠাকুরগাঁও চিনিকলে বিদ্যমান থাকলেও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই চালু রয়েছে মিলটি।
একসময় যেখানে বছরে সাত-আট মাস মাড়াই চলত, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ দিনে। চলতি মৌসুমে ছয় হাজার ২০০ একর জমির আখ মাড়াই করে ৫ হাজার ৬০০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া দুই চিনিকল এলাকার প্রায় ৫০ শতাংশ আখ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ফলন কম, দীর্ঘমেয়াদি ফসল, আখ বিক্রির পুঁজি পেতে হয়রানি—এসব কারণে কৃষক আখচাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। একসময় যেখানে ১৩ থেকে ১৫ হাজার কৃষক আখচাষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৯২-এ।
আখ রোপণ থেকে মাড়াই পর্যন্ত সময় লাগে ১৩ থেকে ১৫ মাস। একই সময়ে কৃষকরা অন্য ফসলের তিন-চারটি চক্র সম্পন্ন করতে পারেন, যেখানে লাভও বেশি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি আখচাষে আগ্রহ কমছে। কৃষকদের দাবি, উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করা গেলে ফলন দুই-তিন গুণ বাড়তে পারে।
এ বছর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার টন আখবীজ সরবরাহ করলেও নতুন কোনো জাত না দিয়ে পুরোনো আখ থেকেই বীজ প্রস্তুত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে কাঙ্ক্ষিত ফলন মিলছে না।
বর্তমানে এক কেজি চিনি উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকা, অথচ বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকায়। ফলে মিলটি বড় অঙ্কের লোকসানে পড়ছে। বাজারে কমদামে আমদানি করা চিনির আধিপত্য থাকায় দেশীয় মানসম্মত চিনি অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। চলতি মৌসুম প্রায় শেষ হলেও গত বছরের প্রায় ৫০০ টন চিনি এখনো গুদামে রয়েছে। সরকারি রেশন সরবরাহই দেশীয় চিনির প্রধান বিপণন মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ১৯৫৬ সালে উৎপাদন শুরু করা এ মিলটি প্রায় ৭২ বছরের পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে চলছে। প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ বাজারে না পাওয়ায় অভিজ্ঞ শ্রমিকরা নিজেরাই যন্ত্রাংশ তৈরি করে উৎপাদন সচল রাখছেন।
মিলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবীর বলেন, মিলটি পুনঃস্থাপন (বিএমআরই) করা জরুরি।
মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) আবু রায়হান বলেন, মানসম্পন্ন উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা বিভাগকে নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে আখের জাত উদ্ভাবন গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সোহরাব হোসেন দাবি করেন, বাংলাদেশ আখ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) উদ্ভাবিত জাতগুলো উচ্চ ফলনশীল, যা একরে ৩৫০ থেকে ৪০০ কুইন্টাল পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। তবে কৃষকরা সঠিক পদ্ধতিতে আখচাষ করছেন না। আগাম রোপণের পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেকে দেরিতে রোপণ করেন এবং লাইনের দূরত্ব কম রাখেন। এতে গাছ চিকন হয় এবং ফলন কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন, সময়োপযোগী নীতিগত সহায়তা ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত না হলে ঠাকুরগাঁও চিনিকলের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।



