ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

করহার না বাড়িয়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের পথ খুঁজছে সরকার

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মার্চ ২৯, ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম
ছবি- সংগৃহীত

‘বর্তমান অর্থনীতি অত্যন্ত নাজুক ও ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো কর-জিডিপি অনুপাত, যা বর্তমানে তলানিতে, অর্থাৎ ৭ শতাংশেরও কম’ এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব ভবনে রোববার (২৯ মার্চ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পশ্চিম এশিয়া ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান বৈশ্বিক সংঘাত দেশের অর্থনীতির জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাই করহার না বাড়িয়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের পথ খুঁজছে সরকার।

একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব আহরণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার, লক্ষ্যমাত্রা ও স্বচ্ছতার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। নব্য সরকারের ইশতেহার অনুযায়ী, ‘কর-জিডিপি অনুপাত দ্রুত ১০ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে, বলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা।

রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। রাজস্ব আহরণবিষয়ক টাস্কফোর্সের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে এসব কথা বলেন উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট ও তথ্যের গরমিল অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত সরকারের আমলে রাজস্ব আয়ের তথ্যে ব্যাপক ‘গোঁজামিল’ দেওয়া হয়েছিল। সরকারি হিসাব ব্যবস্থা বা ‘আইবাস প্লাস’ যাচাই করলে দেখা যায়, অতীতে প্রদর্শিত আয়ের সঙ্গে প্রকৃত সংগ্রহের কোনো মিল ছিল না। মূলত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে কর-জিডিপি অনুপাতকে ইচ্ছাকৃতভাবে তলানিতে রাখা হয়েছিল এবং লুটপাটের পথ প্রশস্ত করা হয়েছিল।’

সরকার আগের মতো দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়াবে না জানিয়ে তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা ও বর্তমান সরকারের পদক্ষেপের ফলে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে মূল দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড প্রবর্তন এবং ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবায়েত ও বৌদ্ধ ধর্মের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষদের জন্য বিভিন্ন যুগান্তকারী সহায়তা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার মূলত তিনটি কৌশলের ওপর জোর দিচ্ছে:
১. বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ: ঘাটতি কমিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

২. অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধি: করের হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদের পরিমাণ এমনভাবে বাড়ানো, যাতে দেশীয় খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমানো যায়।

৩. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: সরকারের মূল লক্ষ্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন বাড়বে এবং এর ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কর্মসংস্থান বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে করদাতার সংখ্যা ও করের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাস্তাঘাটের যে জরাজীর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে, তা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো জিডিপির তুলনায় করের অনুপাত বাড়ানো। এই অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যমেই কেবল জনকল্যাণমূলক খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় রাজস্ব আহরণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার, লক্ষ্যমাত্রা ও স্বচ্ছতার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ, যার ফলে এনবিআরের তিনটি উইংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাদের তিনটি প্রধান উইং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), শুল্ক এবং আয়করের মাধ্যমে আগামী তিন মাসের (চতুর্থ প্রান্তিক) মধ্যে যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

সরকারের ইশতেহার অনুযায়ী, কর-জিডিপি অনুপাত দ্রুত ১০ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। অতীতে অব্যবস্থাপনা ও কর ফাঁকির কারণে দেশের বর্তমান নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে টিকে থাকা কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।

উপদেষ্টা বলেন, বিগত সরকারগুলোর আমলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে কর ফাঁকি, কর পরিহার এবং জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পদ গড়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ কর দেওয়ার কোনো অনুপ্রেরণা পায়নি, কারণ তাদের করের অর্থ জনকল্যাণের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে এবং প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে অপচয় করা হয়েছে। যদি এই কর সঠিকভাবে আদায় হতো, তবে দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নতি ঘটত।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পদ্ধতিগুলো স্বচ্ছ হওয়ায় সরকার যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে প্রস্তুত।