দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি আরও কার্যকরভাবে মূল্যায়নের লক্ষ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। ধারাবাহিক মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রাথমিক স্তরে আবারও চালু হতে যাচ্ছে সামষ্টিক মূল্যায়ন বা লিখিত পরীক্ষা। চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই এই নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রণীত নতুন ‘মূল্যায়ন পদ্ধতি, ২০২৬’-এর খসড়া অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য নির্দেশিকাটি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় রয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (বিদ্যালয়) রেবেকা সুলতানা জানিয়েছেন, আগামী ১৩ জানুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ও সচিবের উপস্থিতিতে একটি বিশেষ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভাতেই চলতি বছর থেকে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর করা হবে কি না—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মূল্যায়নে থাকছে কী কী
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথাগত লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো প্রতিটি বিষয়ে বাধ্যতামূলক মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা যুক্ত করা হচ্ছে। পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে শিক্ষার্থীদের গড়ে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর অর্জন করতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পাস নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ শতাংশ।
প্রতি প্রান্তিকে শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে ৮৫ শতাংশ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থতা বা অনিবার্য কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারলে, আবেদনের ভিত্তিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১০ কর্মদিবসের মধ্যে বিকল্প পরীক্ষা গ্রহণ করবে।
ফলাফল ও শিখন অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ এবং নিয়মিত শিখন অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশনাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নম্বর বিভাজন ও শ্রেণিভিত্তিক মূল্যায়ন
খসড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি শিক্ষাবর্ষে তিনটি প্রান্তিকে (টার্ম) মূল্যায়ন সম্পন্ন হবে।
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি
- ধারাবাহিক মূল্যায়ন: ৫০ নম্বর
- সামষ্টিক মূল্যায়ন: ৫০ নম্বর
- বাংলা, ইংরেজি ও গণিত: মোট ১০০ নম্বর
- অন্যান্য বিষয়: মোট ৫০ নম্বর (২৫ ধারাবাহিক, ২৫ সামষ্টিক)
তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি
- ধারাবাহিক মূল্যায়ন: ৩০ নম্বর
- সামষ্টিক মূল্যায়ন: ৭০ নম্বর
- বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম শিক্ষা: মোট ১০০ নম্বর
- শিল্পকলা ও শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা: মোট ৫০ নম্বর
- যেসব বিষয়ে পাঠ্যপুস্তক রয়েছে, সেসব বিষয়ে ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন এবং পাঠ্যপুস্তকবিহীন বিষয়ে ৫০ নম্বরের মূল্যায়ন করা হবে।
গ্রেডিং পদ্ধতি
নতুন ব্যবস্থায় ফলাফল প্রকাশ করা হবে চারটি গ্রেডে—
ক: অতি উত্তম
খ: উত্তম
গ: সন্তোষজনক
ঘ: সহায়তা প্রয়োজন
শূন্য থেকে ৩৯ নম্বরপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা ‘ঘ’ গ্রেডে পড়বে এবং তাদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান জানান, নির্দেশিকাটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নতুন সরকারের শিক্ষানীতির বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সব দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।




