ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

নানান অভিযোগ নিয়ে শেষ হলো রাবির দ্বাদশ সমাবর্তন

রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৭, ২০২৫, ০৮:৪২ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি ব্যাচের প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে দ্বাদশ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টা থেকে শোভাযাত্রা, জাতীয় সংগীতসহ নানা আয়োজন করা হয়। এ দিন পুরো ক্যাম্পাসে স্নাতক শিক্ষার্থীদের পদচারণায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। তবে সাবেক শিক্ষার্থীদের দাবি না মেনে নেওয়া ও প্রশাসনের অব্যবস্থাপনার কারণে কিছু অভিযোগও ওঠে।

সমাবর্তনের দিনের শুরুতে সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবাস বাংলাদেশ মাঠ থেকে একটি শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রাটি শহীদ শামসুজ্জোহা চত্বর হয়ে স্টেডিয়ামে পৌঁছে। পরে পৌনে ১০টায় অতিথিদের আসন গ্রহণ, জাতীয় সংগীত এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবর্তনের মূল পর্ব শুরু হয়। পরে স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান।

সমাবর্তনে বিভিন্ন অনুষদ ও ইনস্টিটিউটের ৫ হাজার ৬৬৯ জন শিক্ষার্থীর ডিগ্রি উপস্থাপন করেন সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিনবৃন্দ। সমাবর্তন সভাপতি, শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার, তাদের ডিগ্রি প্রদান করেন। সমাবর্তন বক্তার বক্তব্য দেন ইউজিসি চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহা. মাঈন উদ্দিন ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মতিয়ার রহমান। পরে দুপুর আড়াইটায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেন, ‘বাংলাদেশকে এমন স্নাতক প্রয়োজন, যারা শুধু তাদের পেশাগত ক্ষেত্রে উৎকর্ষ লাভ করবে না, বরং যারা প্রশ্ন করবে, তাদের সাফল্য সমাজের ওপর কী প্রভাব ফেলছে। আমরা এমন মানুষ চাই, যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, যারা প্রতিষ্ঠানের শক্তি বাড়াবে, যারা সততার সঙ্গে নেতৃত্ব দেবে।’

তিনি শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, শিক্ষক ও পরিবারের অবদানও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমাজের মধ্যে সহযোগিতা এখানেই শেষ নয়। এটি অব্যাহত থাকবে, কারণ স্নাতকরা এখন তাদের শিক্ষার সঙ্গে নতুন পথ চলতে শুরু করবে।’

তিনি স্নাতকদের বলেন, ‘আপনার শিক্ষা কেবল ক্যারিয়ার গড়ার জন্য নয়, বরং একটি ন্যায়সংগত এবং মানবিক সমাজ গড়ার জন্য ব্যবহার করুন। যারা আপনাদের আগে এসেছিলেন তাদের উদাহরণ অনুসরণ করুন, এবং মনে রাখবেন, জ্ঞান একটি শক্তি, এবং সেই শক্তি সততার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত।’

সমাবর্তন বক্তার বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ স্নাতকদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদেরকে চিন্তাভাবনা করে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে। চারিদিকে অনেক অস্থিরতা ও চঞ্চলতা কাজ করে; এগুলোকে পেছনে ফেলে চলা যাবে না। সবকিছু চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে এগিয়ে যেতে হবে। তোমাদের সাথে আছে তোমাদের পরিবার, শিক্ষকসহ গোটা দেশ।’

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব সমার্টনে অংশগ্রহণকারী গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের সামনের পথ সবসময় মসৃণ হবে না। জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে আপনাদের অবশ্যই ব্যর্থতা, বিপর্যয় ও সন্দেহের মুখোমুখি হতে হবে। সেই সময় এখান থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাগুলি মনে রাখবেন। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন। সর্বোপরি, প্রতিবার পতনের পর আরও শক্তিশালী হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। আপনারা ইতোমধ্যেই আপনার যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন, আমরা বিশ্বাস করি, আপনারা পারবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকের এই অনুষ্ঠান শেষে, যখন আপনি এই ক্যাম্পাস ত্যাগ করবেন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলবেন, প্রজ্ঞার সঙ্গে চিন্তা করবেন এবং মানুষের জন্য কাজ করবেন। দেশ ও সারা বিশ্বকে জানাতে হবে, আপনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্নাতক, যে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত, সেবা করতে প্রস্তুত এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত।’

দ্বাদশ সমাবর্তন ঘিরে স্টেডিয়ামের গ্যালারি, প্যারিস রোড, বিভিন্ন একাডেমিক ভবনসহ পুরো ক্যাম্পাসে স্নাতক শিক্ষার্থীদের পদচারণায় উৎসবমুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ দীর্ঘ বছর পরে বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ ভাগাভাগি করছেন। তাদের সবার গায়ে গাউন এবং মাথায় মর্টারবোর্ড।

দূর থেকে এক নজর দেখেই খানিকটা দৌড়ে এসে বুকে জড়িয়ে নিলেন। একজন আরেকজনকে বললেন, ‘খুব শান্তি লাগছে ভাই।’ জবাবে অন্যজন বললেন, ‘এগুলোই তো কলিজার খাবার।’ কথা বলে জানা গেল, প্রায় পাঁচ বছর পর দেখা হয়েছে আবদুল্লাহ আল হাদি ও মোহাইমিনুল ইসলামের।

হাদি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ও মোহাইমিনুল ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে (বর্তমান বিজয়-২৪ হল) পাশাপাশি কক্ষে ছিলেন। দ্বাদশ সমাবর্তন উপলক্ষে তারা ক্যাম্পাসে এসেছেন।

সমাবর্তনের মূল ভেন্যুতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম ছিল। শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত চেয়ারের দুই-তৃতীয়াংশই ফাঁকা ছিল। শিক্ষা উপদেষ্টা যখন শিক্ষার্থীদের হাতে সনদ তুলে দিচ্ছিলেন তখন উপস্থিত স্নাতকদের একাংশ ভুয়া ভুয়া স্লোগানও দেয়। তবে মূল ভেন্যু স্টেডিয়ামেই ছিল তাদের পদচারণার কেন্দ্র। তারা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, গল্প ও ছবি তুলেছেন।

একাধিক স্নাতক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতিথি নিয়ে অসন্তোষ থাকায় তারা স্টেজে উপস্থিত হননি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি মেনে না নেওয়ায় এই অসন্তোষ তৈরি হয়।

আব্দুল্লাহ আল মামুন নামের এক স্নাতক বলেন, ‘আমরা অতিথি পুনর্বিবেচনাসহ একাধিক দাবি করেছিলাম কর্তৃপক্ষের কাছে। তারা কোনো দাবি মেনে নেয়নি। এতে আমরা সমাবর্তন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলাম। আমাদের কর্মসূচি অনুযায়ী আমরা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম, তবে সমাবর্তনের মূল অনুষ্ঠান বর্জন করেছি।’

দ্বাদশ সমাবর্তনের অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জন্য কোনো আমন্ত্রণপত্র দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

যমুনা টেলিভিশনের রাজশাহী ব্যুরো প্রধান শিবলী নোমান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বাদশ সমাবর্তন বুধবার সকাল বেলাতেই। রাত তিনটা পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমগুলোর অধিকাংশকেই আমন্ত্রণপত্র দেওয়া হয়নি, এমনকি একটি ফোনও দেওয়া হয়নি। ২৫ বছর সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করছি, এমন পরিস্থিতি দেখছি প্রথমবার।’