ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

এনওসি ছাড়াই প্রেক্ষাগৃহে ‘পিনিক’, কীভাবে মিলল সেন্সর সনদ?

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ১২:০৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত

ঈদুল আজহার জমজমাট আবহেই ঢাকার সিনেমাপাড়ায় তৈরি হয়েছে নতুন এক বিতর্ক। প্রেক্ষাগৃহে দর্শক সমাগম ও বক্স অফিসের তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্যেই সামনে এসেছে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য। এবারের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ৯টি সিনেমার অন্যতম আলোচিত সিনেমা ‘পিনিক’-এর বিরুদ্ধে অনাপত্তি সনদ (এনওসি) ছাড়াই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির অভিযোগ উঠেছে। সরকারকে অর্থ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে সিনেমাটি সেন্সর সনদ পেল, তা নিয়ে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের মধ্যে এখন আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফডিসি) অতিরিক্ত পরিচালক (বিক্রয়) রফিকুল ইসলাম জানান, ‘পিনিক’ সিনেমার পক্ষ থেকে এনওসির জন্য আবেদন করা হয়েছিল এবং অ্যাকাউন্টে টাকাও জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে সিনেমাটির প্রযোজকের আগের একটি সিনেমার কিছু টাকা বকেয়া রয়েছে। সেই বকেয়া পরিশোধ না করায় বিএফডিসি থেকে ‘পিনিক’ সিনেমার জন্য কোনো এনওসি দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে তারা সেন্সর বোর্ডে চিঠি পাঠাচ্ছেন বলেও নিশ্চিত করেছেন।

একই বক্তব্য দিয়েছেন বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানিও। তিনি বলেন, এনওসি ছাড়া সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে, বিষয়টি আসলে আমাদের আগে জানা ছিল না। ঈদের সময় একসঙ্গে অনেক সিনেমা জমা পড়ে এবং কাগজপত্র সাধারণত সেন্সর বোর্ড থেকেই যাচাই-বাছাই করা হয়। তবে বিষয়টি জানার পরই আমরা অভিযোগপত্র পাঠিয়েছি। বকেয়া থাকার কারণেই মূলত আমাদের পক্ষ থেকে এনওসি দেওয়া হয়নি। সেন্সর সার্টিফিকেশন বোর্ডের সদস্যও এই এমডি। তবুও কীভাবে তার চোখ এড়িয়ে সিনেমাটি মুক্তির অনুমতি পেল, সেই প্রশ্ন এখন অনেকের।

এনওসি ছাড়া কীভাবে একটি চলচ্চিত্রকে সনদ দেওয়া হলো, তা জানতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান এস এম আবদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে তিনি বলেন, এ সম্পর্কে আমি জানি না। এসব মুখস্থ রাখা সম্ভব না। আমি আপনাকে চিনি না, আপনি ডিডির (ডেপুটি ডিরেক্টর) সঙ্গে কথা বলেন। আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে তারপর কথা বলবেন।

বিএফডিসি কর্তৃপক্ষের এমন গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন ‘পিনিক’ সিনেমার নির্মাতা ও প্রযোজক। পরিচালক জাহিদ জুয়েল বলেন, এনওসি নিয়েই সিনেমাটি মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রযোজক সব আইনি প্রক্রিয়া ও কাগজপত্র সম্পন্ন করেছেন। সিনেমা মুক্তির যে প্রচলিত নিয়ম রয়েছে, তা মেনেই সব করা হয়েছে। নিয়ম না মানলে তো সিনেমাটি মুক্তি দেওয়া যেত না।

প্রযোজক আশরাফ কিটু বলেন, এনওসি ছাড়া কি সিনেমা মুক্তি দেওয়া সম্ভব? আমি এনওসি নিয়েছি এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় টাকাও জমা দিয়েছি, যার রসিদ আমার কাছে আছে। বিএফডিসি যদি এনওসি না দিয়ে থাকে, তাহলে সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেল কীভাবে?

এনওসি বিতর্কের পাশাপাশি ‘পিনিক’ সিনেমার প্রযোজক আশরাফ কিটুর বিরুদ্ধে অধিকাংশ কলাকুশলীর পাওনা পরিশোধ না করার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আদর আজাদ ও বুবলীকে প্রধান চরিত্রে নিয়ে সিনেমাটির শুটিং শুরু হলেও শুরু থেকেই নানা আর্থিক জটিলতা এবং মাঝপথে শুটিং বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।

কলাকুশলীদের ক্ষোভের কিছু স্ক্রিনশট ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে প্রযোজকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পরিশোধ না করার বিষয়ে ভুক্তভোগীদের তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

তাদের দাবি অনুযায়ী, সিনেমাটির সঙ্গে কাজ করা একাধিক প্রধান টেকনিশিয়ানের বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক এখনো বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে সিনেমাটির শিল্প নির্দেশক রহমতুল্লাহ বাসু একাই পাবেন ৫ লাখ ৪ হাজার টাকা। তিনি জানান, কক্সবাজারে শুটিং চলাকালে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই হঠাৎ কাজ বন্ধ করে পুরো ইউনিটকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

এ ছাড়া সিনেমাটোগ্রাফার বা ডিওপি ফরহাদ হোসেনের ২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং সহকারী পরিচালক দলের ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, কাস্টিং ডিরেক্টর জাহিদ ও আর্ট বিভাগের সহকারী আবির অভিযোগ করেছেন, শুটিং শুরুর পর থেকে তারা নামমাত্র কিছু টাকা ছাড়া আর কোনো পারিশ্রমিক পাননি। অভিনেতা এ কে আজাদ সেতুসহ ইউনিটের আরও বেশ কয়েকজন কলাকুশলীও বর্তমানে পাওনাদারের তালিকায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।