ঢালিউডের চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে ফের সরব হয়েছেন দেশের আলোচিত প্রযোজক ও পরিচালক মোহাম্মদ ইকবাল। দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের এক আলাপচারিতায় তিনি খুব স্পষ্ট ও অকপট ভাষায় ইন্ডাস্ট্রির নানা সংকট, অনিয়ম ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে সিনেমা নির্মাণের বাস্তবতা থেকে শুরু করে শিল্পী, প্রযোজক ও টেকনিশিয়ানদের অবস্থান।
দেশের সিনেমার বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রযোজক ও পরিচালক ইকবাল শুরুতেই বলেন, ‘খুব দুঃখের একটা বিষয়, বাংলাদেশে এখন আর সিনেমা বলতে তেমন কিছু নেই। ঈদকেন্দ্রিক দুই-তিনটা সিনেমা মুক্তি পায়, সেটাকেই অনেকে ইন্ডাস্ট্রি বাঁচানো বলে দাবি করে।
কেউ কেউ নিজেকে সুপারস্টার দাবি করে বলে, সে নাকি ইন্ডাস্ট্রি বাঁচিয়ে রেখেছে। প্রশ্ন হলো, ইন্ডাস্ট্রি বাঁচানো মানে কি বছরে শুধু ঈদে দুই-তিনটা সিনেমা? যদি সত্যিই ইন্ডাস্ট্রি বাঁচত, তাহলে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটা করে সিনেমা মুক্তি পেত। তখনই বোঝা যেত যে ইন্ডাস্ট্রি বেঁচে আছে।’ ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংসের পথে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইকবালের ভাষায়, ‘ইন্ডাস্ট্রি এখন পুরোপুরি ধ্বংসের পথে না গেলেও ভয়ংকর অবস্থায় আছে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অনেক মানুষ এখন বেকার। এফডিসিতে গেলে মায়া লাগে, যাদের ছবি দেখে আমরা ছোটবেলা বড় হয়েছি, আজ তারা সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই দৃশ্য খুব কষ্টের। অথচ এখন নতুন করে চার-পাঁচজন হিরো এসেছে, যারা কাজ করছে।’
নতুন প্রজন্মের নায়কদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই নির্মাতা। তিনি বলেন, ‘এই নতুন হিরোদের যোগ্যতা কী? স্ক্রিপ্ট স্কিপ করার মতো তাদের কি আদৌ যোগ্যতা আছে? একজন ডিরেক্টরের কাছে কি তাদের এতটুকু সম্মান আছে যে বলবে, ‘স্ক্রিপ্টটা পাঠান, ম্যানেজার পড়ে দেখবে’? একটা স্ক্রিপ্ট বানাতে একজন ডিরেক্টর কত কষ্ট করে, কত স্বপ্ন নিয়ে লেখে। আর এরা দুই দিনের নায়ক, আজ আছে, কাল নেই। কেউ নিলে নায়ক, না নিলে কিছুই না।’
স্ক্রিপ্ট নিয়ে বেয়াদবি ও দ্বিচারিতা প্রসঙ্গে ইকবাল আরও বলেন, ‘স্ক্রিপ্ট পাঠানো হলে সেটা নিজেরা না পড়ে পিএসকে দেয়, আবার আরও দুই-তিনজনকে দেয়। তারপর তারা বলে, ‘স্ক্রিপ্ট ভালো না, চেঞ্জ করেন।’প্রশ্ন হলো, তোরা যে এত স্ক্রিপ্ট বুঝিস, তোদের কোন সিনেমা চলছে? তোদের একটা সিনেমাও কি চলছে? সবচেয়ে ফ্লপ সিনেমাগুলো তোদেরই। লজ্জা থাকা উচিত।’
ডিরেক্টরের স্বপ্ন নষ্ট করার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘এই দুই-তিনজন হিরোই এসব করে, এর বেশি কেউ না। তারা একজন ডিরেক্টরের স্বপ্নকে তছনছ করে দিতে চায়। স্ক্রিপ্ট ভালো না বলে বদলাতে বলে, অথচ নিজেরা যে স্ক্রিপ্ট বেছে সিনেমা বানিয়েছে, সেগুলোর কোনটাই চলছে না।’
শিল্পী, প্রযোজক ও পরিচালকের সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে ইকবাল বলেন, ‘আমি কখনো এমন প্রডিউসার বা ডিরেক্টর হতে চাই না, যার সামনে কেউ বেয়াদবি করবে। আমার কাছে শিল্পী খুব বড় কিছু না। শিল্পীরা পেমেন্ট নিয়ে কাজ করে। আমার কাছে প্রডিউসারই বড়, কারণ প্রডিউসার টাকা দিলে ডিরেক্টর সিনেমা বানায়। প্রডিউসার টাকা না দিলে ডিরেক্টরেরও দাম নেই। আর্টিস্ট তো প্রশ্নই আসে না।’
‘দেশের জন্য কাজ’ এই কথাটিকে ভণ্ডামি বলেও আখ্যা দেন তিনি। ইকবাল বলেন, ‘অনেকে বলে, তারা দেশের জন্য কাজ করে। দেশের জন্য যদি কাজই করো, তাহলে মাগনা কাজ করো। কিন্তু টাকা চাইতে বসলে তখন আর দেশের কথা থাকে না। আজ আমাদের কত সিনিয়র টেকনিশিয়ান বসে আছে, কাজ নেই।’
বিদেশি টেকনিশিয়ান নির্ভরতা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই নির্মাতা। তিনি বলেন, ‘আজও ইন্ডিয়ান ক্যামেরাম্যান, ডিরেক্টর, ফাইট ডিরেক্টর, ইন্ডিয়ান নাচ ছাড়া সিনেমা বানানো হয় না। কেন? কারণ তারা মনে করে, দেশি টেকনিশিয়ান দিয়ে কাজ হবে না। অথচ প্রশ্ন হলো, কখনো কি পুরোপুরি দেশি টেকনিশিয়ান দিয়ে সিনেমা বানিয়ে দেখা হয়েছে?’
বাংলাদেশি টেকনিশিয়ানদের সক্ষমতা তুলে ধরে নিজের নির্মিত কাজের উদাহরণও দেন ইকবাল। তার ভাষায়, ‘কেউ কি প্রমাণ করতে পেরেছে যে বাংলাদেশের টেকনিশিয়ান খারাপ? বাংলাদেশের সিনেমা খারাপ? আমি ‘ডেড বডি’ বানিয়েছি, ইউটিউবে একটা চ্যানেলেই প্রায় এক কোটির বেশি ভিউ। আটটা চ্যানেলে রিলিজ হয়েছে। হাজার হাজার কমেন্ট এসেছে, নেগেটিভ কমেন্ট খুঁজে পাওয়া যাবে না। সিনেমাতে হয়তো চক্র করে নষ্ট করা হয়েছে, কিন্তু ইউটিউবে মানুষ প্রমাণ দিয়েছে।’
নতুন মুখ তৈরি ও যোগ্যতার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শাকিব খানের নতুন নতুন লুক তৈরি করা, এই কাজগুলো কি বাংলাদেশের টেকনিশিয়ানরা করতে পারবে না? পারবে, অবশ্যই পারবে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা নিজের যোগ্যতা নিয়ে কথা বলি না।’
নিজেদের যোগ্যতা নিয়ে না বলা ও বিদেশমুখিতার প্রসঙ্গে ইকবাল বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় আলিফ-বা পড়েছি, কিন্তু প্রশ্ন করলে অনেকেই বলতে পারে না। বাইরে থেকে দেখে আমরা বড় কথা বলি, কিন্তু নিজের যোগ্যতা নিয়ে কথা বলি না। বাংলাদেশে খুব কম টেকনিশিয়ান, খুব কম হিরো আছে, যারা নিজের যোগ্যতার জায়গা থেকে কথা বলতে পারে।’
সবশেষে দেশীয় সংস্কৃতি ও দেশীয় মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখার আহ্বান জানিয়ে মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, ‘আমি মনে করি টেকনিশিয়ান দেশি হওয়া দরকার, মানুষও দেশি হওয়া দরকার। কারণ বাংলাদেশ আমাদের দেশ। আমাদের কালচার আমাদেরই ভালো লাগবে। বাইরে থেকে এনে সবকিছু করলে নিজের ইন্ডাস্ট্রি কখনো দাঁড়াবে না। দেশের সিনেমা, মানুষ, দেশের টেকনিশিয়ান—এই তিনটা জায়গায় বিশ্বাস রাখতে হবে। তাহলেই ইন্ডাস্ট্রি সত্যিকার অর্থে বাঁচবে।’





