একদিকে ব্যাংকের নিয়মিত দায়িত্ব, অন্যদিকে নাট্য নির্মাণ—দুই ভিন্ন জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে পথ তৈরি করেছেন আশরাফ ব্যাকুল। পেশায় তিনি জনতা ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা। তবে অফিসের কাজ শেষ হলে তার মন পড়ে থাকে গল্পে, চরিত্রে আর সমাজের ভেতরের না বলা কথাগুলোয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই নাটক নির্মাণে নিয়মিত হয়েছেন তিনি।
শৈশব থেকেই বাংলা নাটক ও সংস্কৃতির প্রতি আলাদা টান ছিল আশরাফ ব্যাকুলের। কলেজ জীবনে বন্ধু মিল্টন আহমেদের হাত ধরে মঞ্চনাটকের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়। অন্বেষণ নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে নাটকের ভাষা, দর্শন ও দায়বদ্ধতা বুঝতে শেখেন। পরবর্তীতে টেলিভিশন নাটকের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়, গল্প ও ভাবনার জায়গায় এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সেই উপলব্ধিই তাকে লেখালেখি ও নির্মাণে আরও সক্রিয় করে তোলে।
পরিচালক হিসেবে তার প্রথম নাটক ‘জোসনার বিয়ে’। এরপর একে একে নির্মাণ করেন ‘বড় মেয়ে’, ‘সুখের সংসার’, ‘দুই বোন’ এবং আলোচিত নাটক ‘কোহিনুর চেয়ারম্যান’। তার নাটকগুলোতে প্রেম বা রোমান্টিকতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় পরিবার, দায়িত্ব, সামাজিক টানাপোড়েন ও মানুষের নৈতিক অবস্থান।
নতুন বছরের শুরুতে আশরাফ ব্যাকুল দর্শকদের জন্য নিয়ে আসছেন একাধিক নতুন কাজ। ইউটিউবে মুক্তি পেতে যাচ্ছে ‘মা মনি’, ‘ফুলশয্যা’ এবং বহুল আলোচিত নাটকের সিক্যুয়েল ‘কোহিনুর চেয়ারম্যান–২’। প্রতিটি গল্পেই তিনি সমাজের বাস্তব চিত্রকে সহজ ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
‘বড় বোন’ ও ‘জোসনার বিয়ে’ নাটকে তিনি দেখিয়েছেন শিক্ষার্থী ও পরিবারের দায়িত্ববোধের বিষয়টি। আসন্ন ‘মা মনি’ নাটকে উঠে আসবে একজন সিঙ্গেল মাদারের সংগ্রাম, যিনি সমাজের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অসুস্থ সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। গল্পের সঙ্গে গান যুক্ত করে আবেগকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই নাটকে।
অন্যদিকে ‘কোহিনুর চেয়ারম্যান’ নাটকের মাধ্যমে তিনি সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতরে জনকল্যাণমূলক রাজনীতির ধারণা তুলে ধরেছেন। তার মতে, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়ও এর অংশ।
মিডিয়াতে কাজ করতে গিয়ে কিছু অস্বস্তির কথাও অকপটে বলেন আশরাফ ব্যাকুল। তার মতে, এখানে গল্পের চেয়ে জুটি বা তথাকথিত হিরো-হিরোইন ধারণাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ প্রকৃত অর্থে গল্প যিনি বহন করেন, তিনিই হিরো—সে নারী হোক বা পুরুষ।
দর্শকদের উদ্দেশে তার বার্তা স্পষ্ট—ভালো গল্পের নাটক যদি দর্শক বেশি করে দেখেন, তবে নির্মাতারাও মানসম্মত ও মৌলিক কাজ করতে উৎসাহ পাবেন। পরিবর্তন আসে দর্শকের চাওয়ার মাধ্যমেই।
ব্যাংকের টেবিলের ভেতর থেকেও যিনি গল্পকে হাতছাড়া করতে চান না, আশরাফ ব্যাকুল সেই নির্মাতাদের একজন, যাদের বিশ্বাস—জাঁকজমক নয়, শেষ পর্যন্ত গল্পই দর্শককে ধরে রাখে।


