বছরের শুরুতেই জনপ্রিয় সাইকেডেলিক রক ব্যান্ড ‘সোনার বাংলা সার্কাস’ শ্রোতাদের জন্য উপহার দিয়েছে তাদের বহুল প্রতীক্ষিত অ্যালবাম ‘মহাশ্মশান’। ব্যান্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কেবল গানের সংকলন নয়, বরং এক ঘণ্টা বাহান্ন মিনিট দৈর্ঘ্যের এক অভিনব অডিও সিনেমা। এই ব্যতিক্রমী সৃষ্টিকর্ম নিয়ে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যান্ডটির ভোকালিস্ট ও লিরিসিস্ট প্রবর রিপন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরফান হোসাইন রাফি
প্রশ্ন : কেমন আছেন, কেমন কাটছে নতুন বছর?
উত্তর : নতুন অ্যালবাম ‘মহাশ্মশান’ প্রকাশ পেয়েছে, সবাই শুনছে–সব মিলিয়ে ভালো চলছে।
প্রশ্ন : নতুন বছরের পরিকল্পনা জানাতে রূপালী বাংলাদেশকে বলেছিলেন, ‘সারপ্রাইজ আছে’। এর কিছুদিন পরেই শীতের বৃষ্টির মতো হঠাৎ ডাবল অ্যালবাম প্রকাশ করে ভক্তদের চমকে দিলেন। এ ধরনের আনন্দকে ‘সোনার বাংলা সার্কাস’ কীভাবে উপভোগ করে?
উত্তর : আমরা এভাবেই গান প্রকাশ করি, এটাই আমাদের স্টাইল। আমাদের প্রথম অ্যালবামও এভাবে হয়েছিল। সবাই যেন একটু সারপ্রাইজড হয় এটাই চাই। ‘মহাশ্মশান’-এর ১৭টি গান প্রায় আড়াই-তিন বছর ধরে করছি। এটা প্রকাশ পাওয়াটা আমাদের জন্য এক ধরনের মুক্তি। এই আনন্দটাই হয়, একটু ফাঁকা লাগে, শূন্য লাগে–এই তো।
প্রশ্ন : কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
উত্তর : খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি, দেশের রাজনৈতিক অবস্থার কারণে সবাই তো রাজনৈতিক চিন্তার ভেতরেই মগ্ন। এর মাঝেও যে মানুষ এই অ্যালবাম নিচ্ছে, আর সবচেয়ে মজা লাগছে সবগুলো গানই সবার ভালো লাগছে, এটা একটা বিশাল ব্যাপার। হয়তো এ রকম রাজনৈতিক অবস্থা না থাকলে মানুষের আরও বেশি রেসপন্স পেতাম। তবুও যেটুকু পাচ্ছি, সেটা অনেক। সবাই মুগ্ধ হচ্ছে–দেশে, দেশের বাইরে, এমনকি অন্য ভাষাভাষী মানুষও।
প্রশ্ন : এখন অনেকেই অ্যালবামকে ঝুঁকি মনে করেন, কিন্তু আপনারা দিলেন ডাবল অ্যালবামে একসঙ্গে ১৭টি গান। কখনো ঝুঁকি মনে হয়নি?
উত্তর : এখন তো অর্গানিক খাবার কমে গেছে, বেশির ভাগই সার-টার–ইউরিয়া দিয়ে ফলানো খাবার। এর মাঝখানেও তো অনেকেই অর্গানিক ফুড চাষ করছে, খাচ্ছে, খাওয়াচ্ছে (হাসি)। এটাতে একটা আলাদা আনন্দ। কোনো কিছুরই আসলে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। তুমি যেভাবে দেখবা, সেভাবেই হবে। যেমন- আমাকে অনেকেই বলছে যে, একটা করে গান রিলিজ দেন, এটা কইরেন না, এটা রিস্কি! এসব কোনো কথাই কিন্তু কাজ করেনি। অ্যালবাম ঠিকই কাজ করতেছে–অ্যালবাম না, ডাবল অ্যালবাম। মানুষ শুনতেছে, সো এটা আসলে ডিপেন্ড করে তুমি যে শিল্পকর্মটা দিচ্ছো, এটার ভেতরে যদি আবেদন থাকে, এটার ভেতরে যদি বস্তু থাকে, মানুষ ঠিক কানেক্ট করতে পারবে। এখন এটা অ্যালবাম আকারে দেই বা একক দেই, এটাই হলো ব্যাপার।
প্রশ্ন : এ অ্যালবাম নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বা আবেগঘন মুহূর্তটা কী?
উত্তর : আমার মা নাকি সারাদিন শুনছে। এখানে একটা গান আছে ‘মহাশ্মশান’। এ গানের ভঙ্গিটা এ রকম যে, আমার মাকে আমি চিঠি লিখছি। তো আমার মা নাকি সারাদিন শুনছে। আমাকে কল দিয়ে বলছে, তুই যখন সারাদিন এভাবে মা মা করিস, আমার যে কী ভাল্লাগে। তো মা শুনতেছে–এটা তো অবশ্যই রোমাঞ্চকর।
প্রশ্ন : যদি ভুল না করি, ‘মহাশ্মশান’-এর ঘোষণা এসেছিল প্রায় তিন বছর আগে। এতদিন ধরে অ্যালবামকে বহন করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
উত্তর : আসলে আমরা তো খুব বড় ধরনের ব্যান্ড না যে, সব কাজকাম বন্ধ করে দিয়ে শুধু অ্যালবামের কাজ করব, আর এখানে কোনো স্পন্সরের ব্যাপারও নেই, পুরোটাই নিজেরা। তো কনসার্টের ফাঁকে ফাঁকেই কাজ করতে হয়েছে। এর মাঝে দেশের অবস্থার জন্য প্রায় অনেক দিন কাজ বন্ধ ছিল। তবে আমরা ধৈর্য ধরে কাজটা শেষ করতে পেরেছি, এটাই আনন্দের। অনেকেই অনেক ধরনের কথা বলছিল–কথা দিয়ে কথা রাখিনি, কথার কোনো ঠিক নাই। এখন অ্যালবাম প্রকাশের পর আর কেউ এ কথা বলছে না। তারা বুঝছে, আসলে এই জিনিসটা করতে অনেক সময় লাগে। কারণ এ অ্যালবাম প্রথাগত রক মিউজিকের সাউন্ডে করা না, এটার সঙ্গে অনেক কিছু আছে। এটাকে ‘সোনার বাংলা অর্কেস্ট্রা’ বলা যেতে পারে। এখানে অনেক লেয়ারিংয়ের ব্যাপার-স্যাপার ছিল, আবার আমেরিকান একজন ড্রামার ‘বিল রে’ ড্রামস বাজিয়ে দিয়েছে। তো সবকিছু মিলিয়ে এটা একটা বিশাল যজ্ঞ ছিল। আমরা শেষ করতে পেরেছি, এটাই আনন্দ।
প্রশ্ন : যারা একটানা পুরো অ্যালবামটি শুনছে এবং যারা বিচ্ছিন্নভাবে শুনছে, তাদের মধ্যে গান থেকে অন্তর্নিহিত কিছু পাওয়ার পার্থক্য কী হতে পারে?
উত্তর : এটা তো একটা কনসেপ্টচ্যুয়াল অ্যালবাম, এটা শুধু আলাদা আলাদা গান না, এখানে একটা গানের সঙ্গে আরেকটা গান, একটা গানের পর আরেকটা গান–এ সমস্ত কিছু মিলিয়েই গল্পটা দাঁড়ায়। এটাকে একটা অডিও সিনেমা বলা যেতে পারে। সো কেউ যদি অডিও সিনেমাটা ভালোভাবে বুঝতে চায়, তাহলে ১ ঘণ্টা ৫২ মিনিট হেডফোনে টানা শুনতে হবে। যারা শুনবে, তারাই অডিও চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রের যাত্রাটা টের পাবে। এই অ্যালবামের গানগুলো এখন পর্যন্ত যারা আলাদা শুনছে, তাদের আলাদা আলাদা গান ভালো লাগছে, ওই গানের নামটাই তারা মেনশন করছে। আর যারা পুরোটা শুনছে, তারা বলছে, পুরোটা মিলিয়েই একটা গান, আর এভাবেই এটা উপভোগ করছে তারা।
প্রশ্ন : মঞ্চ থেকে কবে শোনা যাবে ‘মহাশ্মশান’?
উত্তর : হয়তো এপ্রিলের দিকে আমরা আমাদের ‘মহাশ্মশান’ যাত্রা শুরু করব। সবগুলো বিভাগীয় শহরে, সারা বাংলাদেশ ট্যুর, আমাদের সলো কনসার্ট। আগে যেমন করতাম ‘হায়েনা এক্সপ্রেস এক্সপেরিয়েন্স’, ওই রকম। সো আমরা আমাদের অডিয়েন্সের জন্য দেশ এবং দেশের বাইরে আমাদের ‘মহাশ্মশান’ যাত্রাটা করব।
ভক্তদের জন্য ‘সোনার বাংলা সার্কাস’-এর বার্তা
খবর আছে ‘মহাশ্মশান’ যাত্রা আসছে, সবাই প্রস্তুত হও। তোমাদের জন্য বিশাল আকর্ষণ অপেক্ষা করছে। এ অ্যালবামটা নিয়েই আমরা পারফর্ম করব, সবগুলো গানই একসঙ্গে করব । আর খবর আছে মনোযোগ দিয়ে গানগুলো না শুনলে..

