ঢাকা শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৫

বাদ্যযন্ত্রের বাজারে মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিক্রি কমেছে অর্ধেকের বেশি

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২৫, ০৭:২৭ পিএম
ঢাকার বাদ্যযন্ত্রের দোকানগুলো প্রায় ক্রেতাশুন্য। ছবি - সংগৃহীত

রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড, সায়েন্স ল্যাব, বসুন্ধরা সিটি আর শাঁখারীবাজার-যেখানে একসময় বাদ্যযন্ত্র কিনতে ক্রেতাদের লাইন লেগে থাকত, সেখানে এখন যেন নীরবতা। গিটার, তবলা, হারমোনিয়াম, কী-বোর্ড সব সাজানো, কিন্তু দিনের পর দিন বিক্রি নেই। বাদ্যযন্ত্র বিক্রেতারা বলছেন, গত এক বছরে বাজারে এক ধরনের ‘অভূতপূর্ব মন্দা’ নেমে এসেছে।

বিক্রেতাদের মতে, এই বাজারের বড় অংশ নির্ভর করে কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্টেজ শোর ওপর। কিন্তু গত এক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উদ্ভূত নিরাপত্তা ঝুকি ও সংস্কৃতি চর্চার প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাবের কারণে বড় কনসার্ট বন্ধ, ছোট আসরও কমে যাওয়ায় যন্ত্র কেনা বন্ধ হয়ে গেছে। সাউন্ড সিস্টেম থেকে শুরু করে তবলা-একতারা, সবকিছুতেই বিক্রি নেমেছে প্রায় অর্ধেকে। একজন বিক্রেতা জানান, আগে দিনে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা বিক্রি হতো, এখন ৩০ হাজার টাকাও ছুঁতে পারছে না। অন্য এক দোকান মালিক বলেন, ‘আগের মতো ক্রেতা নেই, শখের খাতিরে দু-একটা গিটার বিক্রি হয়, তবলা-পিয়ানোর বাজার একেবারেই বন্ধ।’

ঢাকার সায়েন্সল্যাবে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের দোকান মেলডি এন্ড কোং বর্তমানে প্রায় ক্রেতাশুন্য

এ বাজারের আকার কত বড়, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। কারও কারও ধারণা, স্থানীয় উৎপাদন আর আমদানি মিলে এই বাজারের পরিমাণ ৪-৫ হাজার কোটি টাকা। জার্মানির একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, ২০২৫ সালে এ বাজারের হিসাব দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭,৮০০ কোটি টাকায়। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রকৃত চিত্র তার চেয়ে অনেক ছোট।

প্রভাব পড়েছে পুরো সংগীত অঙ্গনে। হার্ড রক ব্যান্ড ওয়ারফেজের দলনেতা শেখ মনিরুল আলম টিপু বলেন, ‘কনসার্ট নেই, শো নেই। এতে শিল্পী থেকে শুরু করে বাদ্যযন্ত্র বিক্রেতা, সাউন্ড সিস্টেম, লাইটিং-সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। কোনো অনুষ্ঠান না হলে আয়ের চাকা থেমে যায়।’ ঢাকার একাধিক দোকান কর্মী জানালেন, নিয়মিত ক্রেতারা আসা বন্ধ করেছেন, ভাড়ায় যন্ত্র সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও করুণ।

সংকটের চাপে অনেক দোকান আকার ছোট করেছে, কেউ কেউ অংশীদারিত্বে চলছে। কর্মচারী ছাঁটাই হচ্ছে, অনেক কারিগর বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন। একজন সংগীতশিল্পী বলেন, ‘আগে যেসব শো করার সময় শিডিউল দিতে হিমশিম খেতাম, এখন কাজ নেই। আউটডোর শো বন্ধ, অনুমতি মেলে না, ইনডোর শো দিয়ে জীবন চলে না। কমপক্ষে পাঁচ লাখ মানুষ এই খাতে বেকার।’

ঢাকার একটি মিউজিক স্টোরে সাজিয়া রাখা বাদ্যযন্ত্র। ছবি - সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান প্রিয়াংকা গোপের মতে, ‘নতুন কাজের সুযোগ কম, বড় শো নেই। কারাওকের কারণে মানুষ সরাসরি বাদ্যযন্ত্র বাজানোর চেয়ে রেকর্ডেড মিউজিক চালিয়ে গান গাইতে বেশি আগ্রহী। শখে গিটার কেনার সংখ্যাও কমেছে। দাম বেড়েছে, আগ্রহ কমেছে-দুটো মিলেই বাজারে মন্দা।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাদ্যযন্ত্রের বাজার বাঁচাতে হলে কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর সামাজিক আয়োজন ফিরিয়ে আনা জরুরি। নইলে এ মন্দা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিতে রূপ নেবে, এবং রাজধানীর বাদ্যযন্ত্রের দোকানগুলো নীরবতার সঙ্গী হয়েই থাকবে।