স্মার্ট শিল্প-কারখানা ও তুখোড় সব এআই-রোবটের ভিড়ে বইপড়ার সংস্কৃতিটা যেন উপেক্ষিত না থাকে। এ জন্য রীতিমতো আইন করে গ্রন্থপাঠের পরিসর বাড়াতে যাচ্ছে চীন। পড়ুয়ার সংখ্যা তো বাড়াতেই হবে, সেই সঙ্গে বই পড়ার আয়োজনেও কোনো ত্রুটি রাখা যাবে না। এমনটা মাথায় রেখেও জাতীয় বিধিমালায় নতুন কিছু সংযোজনের কথা ভাবছে চীন প্রশাসন।
জনসাধারণের পাঠাভ্যাস জোরদারে আরও বেশি অবকাঠামোগত সহায়তা, দীর্ঘ সময় পাঠাগার খোলা রাখা, আধুনিক পাঠকক্ষ গড়ে তোলা এবং পরিকল্পিত অর্থায়ন—সব মিলিয়ে বই নিয়ে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথে এগোচ্ছে দেশটি। এর মাঝেই ঘোষণা এলো—এখন থেকে এপ্রিলের চতুর্থ সপ্তাহের আরেক নাম হবে জাতীয় পাঠ সপ্তাহ। একদিনের বিশ্ব বই দিবসের বিস্তৃতি ছাড়িয়ে গোটা সপ্তাহজুড়েই হবে গোটা নীরব কিন্তু গভীর এক উৎসব।
চীনের রাষ্ট্রপরিষদের অনুমোদিত এই বিধিমালার লক্ষ্য শুধু পড়ুই তৈরি করা নয়; বরং নাগরিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক সক্ষমতাও সমৃদ্ধ করা চাই। বইপড়াকে এখানে ব্যক্তিগত শখ হিসেবে নয়, জাতীয় সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
প্রকাশক, গ্রন্থাগার, বইয়ের দোকান ও সামাজিক সংগঠন—সবার সম্মিলিত উদ্যোগকে একটি কাঠামোর ভেতর আনছে এই আইন। শিশু থেকে প্রবীণ, শহর থেকে গ্রাম—সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই ছয়টি অধ্যায় ও ৪৫টি নিবন্ধের সমন্বয়ে তৈরি ওই বিধিমালার সারকথা।
দুই দশকের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় ২০২৪ সালে চীনের সামগ্রিক পাঠের হার পৌঁছেছে ৮২ শতাংশে। তবু অঞ্চলভেদে বৈষম্য, মানসম্মত বিষয়বস্তুর ঘাটতি ও ডিজিটাল পাঠের অসম মান রয়ে গেছে। নতুন আইন সেই ফাঁকগুলো পূরণেই পথ দেখাবে—ভালো বইকে দেওয়া হবে ‘জনস্বার্থ’ স্বীকৃতি।
বেইজিং-ভিত্তিক ব্রাইট ওয়ার্ল্ড রিডিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং দীর্ঘদিন ধরে পঠন উদ্যোগের পক্ষে কাজ করা ছেন মিংলিয়াংয়ের মতে, এ ধরনের বিধিমালায় বোঝা যায়, চীনের জনগণের মধ্যে বইপড়ার প্রচার করতে সরকারও মরিয়া। এটি একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার। পদক্ষেপটি দেশের নাগরিকদের বৌদ্ধিক, নৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সুস্থতা ঠিক তো রাখবেই, সেই সঙ্গে একটি জাতির সংকল্পকেও তুলে ধরবে আরও দৃঢ়ভাবে।
ছেন বলেন, এই উদ্যোগের প্রভাব ব্যক্তিগত অভ্যাস বা জীবনধারার বাইরেও পড়বে।
তার ভাষায়, বোঝাবুঝি বৃদ্ধি, সামাজিক সংহতি জোরদার এবং সামাজিক শাসন বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই আইন।
এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রকৃতি তুলে ধরে ছেন বলেন, ‘কিন্ডারগার্টেনের শিশু থেকে বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী থেকে পেশাদার, লিঙ্গ, পেশা বা বয়স নির্বিশেষে, সকলেই এই উদ্যোগের অংশগ্রহণকারী। এখানে প্রত্যেকেই কোনো না কোনো দিক দিয়ে সুবিধাভোগী হতে পারে।’ নতুন নিয়ম প্রবর্তন পঠন প্রচারের জন্য সরকারের টেকসই প্রচেষ্টার সর্বশেষ পদক্ষেপ।
বইপড়া ও পড়ার হার বাড়ানো নিয়ে এ ধরনের বিধিমালা তৈরিতে চিয়াংসু প্রদেশ ২০১৪ সাল থেকে সক্রিয়। এ প্রদেশের দেখাদেখি চীনজুড়ে ২০টিরও বেশি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব নিয়মকানুন চালু করেছে। আঞ্চলিক চাহিদা পূরণ করার মতো মডেল তৈরি করেছে সবাই।
২০১৬ সালের এপ্রিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করে চীন। ওই সময় চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার বিভাগ এবং ১০টি অন্যান্য কেন্দ্রীয় বিভাগ এবং মন্ত্রণালয় যৌথভাবে প্রথম জাতীয় পর্যায়ের পাঠদানের প্রচারণার উদ্যোগ হাতে নেয়।
তারপর থেকে, ২৩ এপ্রিল দিনটি চীনে বৃহৎ পরিসরে পাঠদান প্রচারণার একটি মাহেন্দ্রক্ষণে পরিণত হয়েছে। ওই দিন থেকে সরকার বইয়ের প্রতি জনসাধারণের প্রবেশাধিকার উন্নত করা এবং সাংস্কৃতিক পরিষেবার মানোন্নয়নেও যত্নশীল হতে শুরু করে। ২০১৪ সাল থেকে টানা ১২ বছর ধরে চীনের সরকারি কর্ম প্রতিবেদনেও লেখা হতে থাকল নানা ধরনের পাঠদান ও বইপড়া কর্মসূচির নানা বিষয়।
২০২৫ সালে, চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০২৬-৩০) নীতিগত অগ্রাধিকারের রূপরেখা তুলে ধরে সমাজে পাঠের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়। এতেও বিধিমালা কার্যকরের উদ্যোগটি উচ্চতর পর্যায়ে চলে যায়।
চায়না একাডেমি অব প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায় দুই দশকের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় ২০২৪ সালে চীনের জনসংখ্যার মধ্যে সামগ্রিক বইপড়ুয়ার হার ৮২ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০০৪ সালে যা ছিল ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ।
তথ্যে দেখা যায়, চীনে এখন ৩,২০০ টিরও বেশি পাবলিক লাইব্রেরি আছে। বইয়ের দোকান আছে এক লাখেরও বেশি (অনলাইন বাদ দিয়ে)। শুধু বেইজিংয়েই বছরে বইপড়া নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় ৩০ হাজারের বেশি।
পড়ার পাঠ তো গেল, কিন্তু মানসম্মত বা ‘কাজের বই’ পাওয়া যাবে কিনা, প্রকাশকরাও যাচ্ছেতাই ছাপিয়ে যাচ্ছে কিনা, এসব তদারকিতেও নজর আছে চীন প্রশাসনের। আপাতত তাই সদ্য নির্মিত প্রবিধানটিতে ‘ভালো ও কাজে লাগবে’ এমন কন্টেন্ট তৈরির জন্য একটি আইনি বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে।
প্রকাশকরা যেন তাদের অফারগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করে, সেইসঙ্গে ক্যাটালগ কাঠামো যেন সবচেয়ে উন্নত হয় সে জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সহায়তা এবং নির্দেশনা প্রদান করা হবে বলেও জানানো হয় প্রবিধানে।
চীনের এই প্রবিধানে অপ্রাপ্তবয়স্ক, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট সহায়তাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ ও সীমান্তবর্তী এলাকাসহ স্বল্পোন্নত অঞ্চলগুলোর জন্য সহায়তাকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বই নিয়ে এমন নীতিমালায় সরকার, স্কুল, প্রকাশক এবং অন্যান্য অংশীদারদের ভূমিকাও স্পষ্ট করা হয়েছে। তাই এটি মূলত বাজার কিংবা সামাজিক প্রক্রিয়াগুলোতে রয়ে যাওয়া ফাঁকফোকরগুলোই পূরণ করবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন