ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বিয়েতে কেন স্বর্ণের গহনাই পরতে হবে?

শাওন বিশ্বাস
প্রকাশিত: মার্চ ২, ২০২৬, ১১:৪৬ এএম
স্বর্ণের গহনা পরিহিত নববধূ। ছবি : সংগৃহীত

স্বর্ণের দাম বাড়ায় অনেকে নিশ্চয়ই চিন্তায় পড়ে গেছেন। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণ কিনতে খরচ পড়ছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ১০৪ টাকা। প্রাচীনকাল থেকেই বিয়েতে স্বর্ণের অলংকার রীতিমতো বাধ্যতামূলক উপকরণে পরিণত হয়েছে। বিয়েতে  স্বর্ণের গহনার কি কোনো যৌক্তিক কারণ রয়েছে, নাকি এটি একটি সম্পদ বা বিনিয়োগের মাধ্যম?

বাঙালি সংস্কৃতিতে স্বর্ণ কেবল গহনা নয়, এটি একটি আশীর্বাদ। আদিমকাল থেকেই স্বর্ণকে পবিত্র ধাতু হিসেবে গণ্য করা হয়। মনে করা হয়, কনের গায়ে স্বর্ণের ছোঁয়া তার নতুন জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। এই ট্র্যাডিশন বংশপরম্পরায় চলে আসছে বলেই আজও আধুনিক কনেরা বিয়ের পিঁড়িতে বসার সময় স্বর্ণের অলংকার বেছে নেন।

আমাদের দেশে বিয়ের স্বর্ণ অনেক সময় এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়। দাদি বা নানি যখন নিজের বিয়ের গহনা নাতনিকে দেন, তখন তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ আর শত বছরের স্মৃতি। এই ইমোশনাল ভ্যালু স্বর্ণ ছাড়া অন্য কোনো উপাদানে খুঁজে পাওয়া কঠিন।

ইসলামে নারীর জন্য স্বর্ণ অলংকার হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ ও হালাল করা হয়েছে। তবে পুরুষের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ।

ইসলাম কনে বা নারীদের পরিমিত সাজসজ্জার অনুমতি দেয়। বিয়ের মতো বিশেষ অনুষ্ঠানে কনেকে স্বর্ণের অলংকারে ভূষিত করাকে তার মর্যাদা ও আনন্দের প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের মোহরানা হিসেবে স্বর্ণ দেওয়া হয়। এটি কনের সম্পূর্ণ নিজস্ব সম্পদ, যা তাকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেয়। পবিত্র কোরআনে নারীদের সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আর স্বর্ণ সেই সম্পদের একটি স্থায়ী রূপ।

ইসলামে স্বর্ণ পরা বৈধ হলেও লৌকিকতা বা অহংকার প্রদর্শনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ঋণ করে বা অন্যকে ছোট করার জন্য স্বর্ণ পরা ধর্মীয়ভাবে কাম্য নয়।

হিন্দু ধর্মে স্বর্ণকে অত্যন্ত পবিত্র এবং লক্ষ্মী দেবীর প্রতীক মনে করা হয়। বিয়েতে স্বর্ণের গহনা পরাকে শুভ বা মাঙ্গলিক মনে করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, স্বর্ণ মানুষকে অশুভ শক্তি থেকে দূরে রাখে এবং সংসারে সমৃদ্ধি আনে।

প্রাচীন হিন্দু আইন অনুযায়ী, বিয়ের সময় কনে যে স্বর্ণালংকার উপহার পায়, তাকে ‘স্ত্রীধন’ বলা হয়। এটি কনের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি, যা তাকে প্রতিকূল সময়ে সুরক্ষা দেয়।

বৌদ্ধ ধর্মে স্বর্ণকে পরিশুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের প্রতীক ধরা হয়। বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের বিয়েতে কনেকে স্বর্ণের অলংকার পরানো হয় পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে।

খ্রিষ্টান ধর্মে সরাসরি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বাইবেলে বিভিন্ন জায়গায় স্বর্ণকে মূল্যবান উপহার এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কথিত আছে, যিশুর জন্মের পর উপহার হিসেবে স্বর্ণ আনা হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের গুরুত্ব আগেও ছিল, এখনো আছে। বিশেষ করে মেয়েরা সব সময় স্বর্ণের গহনা কেনাকে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় হিসেবে দেখে। কারণ, তাদের মধ্যে সব সময় এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক ক্ষেত্রেই তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নন বা স্বাধীন নন। পুরুষদের ওপর তাদের নির্ভর করতে হয়। এ ক্ষেত্রে স্বর্ণের গহনা তাদের জন্য এক বিশাল সুরক্ষিত সম্পদ। স্বর্ণের গহনা স্বামী বা শ্বশুরবাড়ি কিংবা নিজের বাবা-মা যেখান থেকেই আসুক, নারীরা এটিকে সঞ্চয় হিসেবেই দেখে।

তাদের মতে, মানুষ এখন শুধু উপলক্ষ হিসেবে স্বর্ণের গহনা কিনছে, এমন নয়। শুধু বিয়ে বা ঈদের সময়ই নয়, হাতে অর্থ জমা হলেই সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে তারা স্বর্ণ কিনে রাখছে। এখন স্বর্ণ কেনার উপলক্ষও বেড়েছে। বিয়ের পাশাপাশি এখন জন্মদিন বা সাধারণ কোনো অনুষ্ঠানে গেলেও ছোট একটি ডায়মন্ডের রিং পরতে চায় অনেকে। মানুষ যেকোনো বিশেষ দিন উদযাপন করতে চায়, স্ট্যাটাস বজায় রাখতে চায়; তাই স্বর্ণের গহনাও কিনতে চায়। তবে নারীদের জন্য গহনা কেবল স্ট্যাটাসের প্রতীক নয়, বরং গচ্ছিত সম্পদও বটে।