এইচএসসি শেষ করে কেবল উচ্চশিক্ষার আঙিনায় পা রেখেছেন এক তরুণী। সাধারণ দশজন শিক্ষার্থীর মতো কেবল পড়াশোনায় ডুবে না থেকে, মনের ভেতর লালন করা মিডিয়ার প্রতি গভীর অনুরাগ তাকে টেনে নিয়ে আসে এক অন্য জগতে। ২০০৮ সাল থেকে শুরু হয় ফ্রিল্যান্সিং। পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যারিয়ারের এই দ্বৈত লড়াই শুরুতে বেশ চ্যালেঞ্জিং হলেও, সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা আর অদম্য শেখার আগ্রহ তাকে পাইয়ে দেয় আগামীর পথ। তিনি দেওয়ান ফারহানা মাসুক ইরা। আজ যিনি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় হসপিটালিটি ব্র্যান্ড ‘ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইরার ক্যারিয়ারের ঝুলি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। গ্রামীণফোন, এয়ারটেল, এলজি বাটারফ্লাই, প্রাণ আরএফএল এবং ওয়ালটনের মতো দেশের নামীদামি ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার আত্মবিশ্বাসকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রডাকশন হাউস, ই-কমার্স, এমনকি এনজিও-এর মতো ভিন্ন ভিন্ন সেক্টরে কাজ করার ফলে অর্জন করেছেন বহুমুখী দক্ষতা। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় তার দীর্ঘ বিচিত্র কর্মজীবন তুলে ধরেছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন।
আপনি ২০০৭ সালে এইচএসসি শেষ করার পর থেকেই মিডিয়া ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন এবং ২০০৮ সাল থেকে ফ্রিল্যান্সিং করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি এই শুরুর দিনগুলোতে নিজেকে তৈরি করার চ্যালেঞ্জ কেমন ছিল?
মাশুক : ২০০৭ সালে এইচএসসি শেষ করার পর থেকেই মিডিয়ার প্রতি আমার আগ্রহ আমাকে এই জগতে নিয়ে আসে এবং ২০০৮ সাল থেকে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করি। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করা শুরুতে বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা, শেখার আগ্রহ এবং ধারাবাহিক পরিশ্রম আমাকে ধীরে ধীরে এই পথের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছে এবং নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ দিয়েছে।
একজন মডেল এবং শিল্পী হিসেবে গ্রামীণফোন, এয়ারটেল বা এলজির মতো বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে কতটা সাহায্য করেছে?
মাশুক : গ্রামীণফোন, এয়ারটেল এবং এলজি বাটারফ্লাই, প্রাণ-আরএফএল, ওয়ালটনের মতো নামীদামি ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার জন্য খুবই মূল্যবান ছিল। এসব কাজ শুধু পেশাগত দক্ষতাই বাড়ায়নি, বরং আত্মবিশ্বাসও অনেক বাড়িয়েছে। বড় প্ল্যাটফর্মে কাজ করার মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ পেয়েছি।
ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রডাকশন হাউস, এনজিও এবং ই-কমার্স আপনি অনেক ভিন্ন ভিন্ন সেক্টরে কাজ করেছেন। এই বহুমুখী অভিজ্ঞতা বর্তমান করপোরেট জীবনে আপনাকে কীভাবে সাহায্য করছে?
মাশুক : ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রডাকশন হাউস, এনজিও এবং ই-কমার্স এই ভিন্ন ভিন্ন সেক্টরে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে বহুমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো বর্তমান করপোরেট জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যোগাযোগ দক্ষতা এবং বিভিন্ন পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে অনেক সহায়তা করছে।
পেশাগত জীবনে ‘বিজনেস ডেভেলপমেন্ট’ থেকে ‘পিআর এবং কমিউনিকেশন’ এই পরিবর্তনের পেছনের গল্পটি কী?
মাশুক : পেশাগত জীবনের শুরুতে বিজনেস ডেভেলপমেন্টে কাজ করার মাধ্যমে করপোরেট স্ট্র্যাটেজি এবং ক্লায়েন্ট ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে কমিউনিকেশন, ব্র্যান্ডিং এবং সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে, যা আমাকে পরবর্তীতে চজ ও কমিউনিকেশন সেক্টরে নিয়ে আসে।
২০১৯ সাল থেকে আপনি ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে আছেন এবং ২০২৩ সালে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। আতিথেয়তা শিল্পে (হসপিটালিটি) জনসংযোগের কাজটির সবচেয়ে উপভোগ্য এবং চ্যালেঞ্জিং দিক কোনটি?
মাশুক : ২০১৯ সাল থেকে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে কাজ করছি এবং ২০২৩ সালে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি পাওয়া আমার জন্য বড় একটি মাইলফলক। আতিথেয়তা শিল্পে জনসংযোগের সবচেয়ে উপভোগ্য দিক হলো বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কাজ করা এবং প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ব্র্যান্ড ইমেজ তুলে ধরা। তবে প্রতিনিয়ত উচ্চমানের সেবা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখা এই কাজের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
একটি বড় প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ইমেজ ধরে রাখার ক্ষেত্রে একজন নারী হিসেবে আপনার বিশেষ কোনো দৃষ্টিভঙ্গি বা স্ট্র্যাটেজি থাকে কি?
মাশুক : একজন নারী হিসেবে আমি মনে করি সংবেদনশীলতা, মনোযোগ এবং কার্যকর যোগাযোগ ব্র্যান্ড ইমেজ ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমি সবসময় চেষ্টা করি প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধ ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে সামনে রেখে একটি ইতিবাচক এবং দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করতে।
নারীদের ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে আপনি কী ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন এবং সেগুলো কীভাবে কাটিয়ে উঠেছেন?
মাশুক : আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের ক্যারিয়ার গড়ার পথে কিছু সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক ধারণার মুখোমুখি হতে হয়। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। তবে আত্মবিশ্বাস, পরিবারের সমর্থন এবং নিজের লক্ষ্যকে স্পষ্ট রেখে ধৈর্য ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সেই বাধাগুলো অতিক্রম করার চেষ্টা করেছি।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য সামনে রেখে যারা নতুন ক্যারিয়ার শুরু করছেন, বিশেষ করে যারা মিডিয়া বা করপোরেট জগতে আসতে চান, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?
মাশুক : এইবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য গিভ টু গেইন বা লাভ করার জন্য দান করা, ভালো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায়। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মের নারীদের উদ্দেশ্যে আমার পরামর্শ নিজের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসকে গুরুত্ব দিন। নিয়মিত শেখার চেষ্টা করুন, ধৈর্য ধরে কাজ করুন এবং নিজের স্বপ্নের প্রতি দৃঢ থাকুন। মিডিয়া বা করপোরেট যে ক্ষেত্রেই কাজ করুন না কেন, নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে এগিয়ে গেলে সফলতা আসবেই। কিন্তু নারীরা সবসময় কোনো কিছুর আসা না করে সবকিছু বিলিয়ে দেয়। দেশ, সমাজ ও পরিবারের উচিত নারীর যথাযথ প্রাপ্য ও সম্মান দেওয়া। তা হলে দেশ-সমাজ এগিয়ে যাবে।
আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশের করপোরেট সেক্টর নারীদের নেতৃত্বের জন্য এখন আগের চেয়ে বেশি ইতিবাচক?
মাশুক : আমার মনে হয় আগের তুলনায় বাংলাদেশের করপোরেট সেক্টর এখন নারীদের নেতৃত্বকে অনেক বেশি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে। বর্তমানে অনেক নারী গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকায় কাজ করছেন, যা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা তৈরি করছে।
ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে নিজের সাফল্যের সংজ্ঞাকে আপনি কীভাবে দেখেন? আগামী ৫ বছরে নিজেকে কোন অবস্থানে দেখার স্বপ্ন দেখেন?
মাশুক : আমার কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা হলো নিজের কাজের মাধ্যমে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করা এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে আরও দক্ষ করে তোলা। আগামী পাঁচ বছরে আমি নিজেকে করপোরেট কমিউনিকেশন ও ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্টে আরও বড় দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখতে চাই। তবে তার আগে আমার মূল লক্ষ্য হলো সঠিকভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করা এবং আমার মনে হয় শেখার কোনো শেষ নেই! তাই আমিও যতটুকু সম্ভব আরও শিখতে চাই যাতে হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিতে আমি প্রপার কন্ট্রিবিউশন করতে পারি।


