ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বৈশাখী মেলায় হারিয়ে যাওয়া লোকজ উৎসবের সেই সব খেলা

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ০১:১৬ পিএম
বৈশাখী মেলায় হারিয়ে যাওয়া লোকজ উৎসব। ছবি : সংগৃহীত

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর এই পার্বণগুলোর মধ্যে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ উদযাপন আমাদের জাতীয় সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক সময় বৈশাখী মেলা মানেই ছিল নাগরদোলা, মাটির পুতুল আর দিনভর চলা গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী সব খেলাধুলা। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এবং নগরায়নের ভিড়ে সেই সব চিরচেনা খেলা এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে আসছে। তবুও শেকড়ের টানে বৈশাখ এলেই অনেক জায়গায় ফিরে আসে বলীখেলা, লাঠিখেলা কিংবা হা-ডু-ডু’র মতো রোমাঞ্চকর সব আয়োজন।

১. চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের প্রতীক: জব্বারের বলীখেলা
বৈশাখের আলোচনার শুরুতেই আসে চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানের শত বছরের পুরনো ‘জব্বারের বলীখেলা’। ১৯০৯ সালে আব্দুল জব্বার সওদাগর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে এই কুস্তি প্রতিযোগিতার সূচনা করেন। লালদিঘীর এই ঐতিহাসিক বলীখেলা কেবল একটি কুস্তি ম্যাচ নয়, এটি এখন চট্টগ্রামের সংস্কৃতির এক মহোৎসব। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নামী-দামী বলীরা (কুস্তিগীর) তাদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য এখানে জড়ো হন।

২. লাঠিখেলার রোমাঞ্চ
ঢোলের তালের সাথে লাঠির ঠোকাঠুকি-মেলা প্রাঙ্গণে লাঠিখেলার দৃশ্য মানেই অন্যরকম এক উত্তেজনা। এক সময় গ্রামে কোনো উৎসব হলে লাঠিয়াল বাহিনী তাদের নৈপুণ্য দেখাত। হাতে লম্বা বাঁশের লাঠি নিয়ে প্যাঁচ আর কসরতের মাধ্যমে আত্মরক্ষার এই কৌশলটি এক সময় অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। বর্তমানে নড়াইল, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের কিছু মেলায় এখনো এই বীরত্বপূর্ণ খেলাটির দেখা মেলে।

৩. প্রাণের খেলা হা-ডু-ডু ও মোরগ লড়াই
হা-ডু-ডু: বাংলাদেশের জাতীয় খেলা কাবাডির আদি রূপ হলো হা-ডু-ডু। দম ধরে রেখে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে ছুঁয়ে আসার এই খেলার সঙ্গে বাঙালির আবেগ জড়িয়ে আছে। বৈশাখী মেলা উপলক্ষে গ্রামবাংলার মাঠে মাঠে এখনো যুবকদের এই শক্তির লড়াই দেখা যায়।

মোরগ লড়াই: মেলায় ছোট-বড় সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মোরগ লড়াই। বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মোরগগুলোর লড়াই দেখার জন্য মেলার এক কোণে উপচে পড়া ভিড় থাকতো। এটি কেবল একটি খেলাই নয়, গ্রামীণ বিনোদনের একটি শৈল্পিক মাধ্যমও বটে।

৪. সংকটে আমাদের লোকজ ঐতিহ্য
কালের বিবর্তনে ভিডিও গেম আর স্মার্টফোনের ভিড়ে আমাদের দেশীয় খেলাগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। মাঠের অভাব এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে বলীখেলা বা লাঠিখেলার মতো বিষয়গুলো এখন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ।

সংস্কৃতি কর্মীদের মতে, বৈশাখী মেলাগুলোতে এই সব লোকজ খেলার আয়োজন বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ এই খেলাগুলো কেবল শারীরিক কসরত নয়, বরং আমাদের সাহসিকতা ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিটি মেলায় অন্তত একটি লোকজ খেলার বিভাগ থাকলে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের আসল শেকড়কে চিনতে পারবে।

পহেলা বৈশাখ মানেই নতুনভাবে বেঁচে থাকার প্রেরণা। আর এই প্রেরণার অন্যতম উৎস আমাদের এই লোকজ খেলাগুলো। আধুনিকতার জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিলেও আমাদের ঐতিহ্যের এই সম্পদগুলোকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। আসছে নববর্ষে শহরের যান্ত্রিকতা ছাপিয়ে আবার জেগে উঠুক বলীখেলা আর লাঠিখেলার সেই জয়ধ্বনি।