বাঙালিয়ানার ইতিহাস আর ঐহিত্যের সঙ্গে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপন উৎসব জড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে। মেয়েদের লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, ছেলেদের পাঞ্জাবি, আর বৈশাখী মেলা— সঙ্গে পান্তা-ইলিশ যেন এ উৎসবের মূল অনুসঙ্গ। ইলিশ ভাজা, মরিচ পোড়া, বেগুন ভাজা, আলুভর্তা আর পান্তা ইলিশের পদ না হলে যেন বৈশাখের আমেজ জমেই না।
আবহমানকাল থেকেই মেলা, হালখাতাসহ নানাভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে আসছে বাঙালি। নববর্ষ উপলক্ষে দিনটিতে ঘরে ঘরে ভালো খাবারের আয়োজনও থাকত। গরমে রোদে কাজ করার জন্য কৃষকের উপযোগী খাদ্য ছিল পান্তা ভাত। সূর্য ওঠার পরপরই পান্তা ভাত খেয়ে কাজে বের হতো কৃষক। এর সঙ্গে কখনো কখনো যোগ হতো বেগুনপোড়া, আলুসেদ্ধ বা আলুভর্তা। মাঝে মাঝে আবার পান্তা ভাতের সঙ্গে যুক্ত হতো চিংড়ি, ট্যাংরা, পুঁটিসহ নানান মাছের তরকার।
বৈশাখের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের প্রচলনের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। জানা গেছে, আশির দশকের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী সুযোগটি গ্রহণ করেন। নিজেদের আগ্রহে অস্থায়ী দোকান দিয়ে পান্তা ভাত আর ভাজা ইলিশ বিক্রি শুরু করেন তারা।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলা নববর্ষ উৎসবের দুটি দিক আছে—প্রথমটি আবহমান বাংলায় ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সামাজিক রীতি। অন্যটি ৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
৮০-এর দশকে রমনাকে কেন্দ্র করে নববর্ষে কিছু খাবারের দোকান বসে। যারা ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখতে যেতেন তারা সেখানে খেয়ে নিতেন। এমনই একবার অল্প কয়েকজন মিলে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা বিক্রি করলেন এবং তা সব বিক্রি হয়ে গেল। তাদের উৎসাহিত করতে এবং নতুন একটা কিছু প্রবর্তন করার মানসিকতা নিয়ে একটি গ্রুপ প্রচারণা চালাতে লাগল, যাদের মধ্যে দু-একজন গণমাধ্যমকর্মীও ছিলেন।
বিষয়টা আর কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মুনাফালোভী গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে বৈশাখের অনেক কিছুই করপোরেটদের দখলে চলে যায়।
অনেক গবেষক যারা বাংলার ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন তাদের মতে, বৈশাখ অর্থাৎ এপ্রিল মাস জাটকা ইলিশের নদী থেকে সাগরে ফিরে যাওয়ার সময়। তাই জাটকা নিধন রোধে এ সময় সরকারিভাবে ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ। ট্রেন্ডে গা ভাসাতে গিয়ে আমরা অনেকেই ভবিষ্যতের ইলিশগুলোকে শেষ করে দিচ্ছি। তাই পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার ব্যাপারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করার পক্ষে মৎস্যবিদসহ সংশ্লিষ্টরা।
পান্তার সঙ্গে ইলিশ না আলুভর্তা—কোনটা বেশি ‘বাঙালি’?
পান্তা ভাত হাজার বছরের বাঙালির প্রাত্যহিক খাদ্য। পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ নাকি আলু ভর্তা—কোনটি বেশি ‘বাঙালি’, তা নির্ভর করে আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন তার ওপর।
১. আভিজাত্য ও উৎসবে ইলিশ:
বৈশাখ এলেই ইলিশের দাম বেড়ে যেন আকাশ ছোঁয়। নগর জীবনে পান্তা-ইলিশ মূলত আমাদের পহেলা বৈশাখের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এখন বাঙালির উৎসবের প্রতীক এবং সামাজিকভাবে অত্যন্ত জনপ্রিয় এক সমন্বয়। শহুরে আভিজাত্য বা বিশেষ আয়োজনের কথা ভাবলে ইলিশই এগিয়ে।
২. শিকড় ও প্রাত্যহিকতায় আলুভর্তা:
অন্যদিকে, পান্তা ভাতের আদি ও অকৃত্রিম রূপ হলো আলুভর্তা, কাঁচা মরিচ এবং পিঁয়াজ। এটি বাংলার আম মানুষের প্রতিদিনের খাবার এবং আমাদের কৃষি সংস্কৃতির গভীর শিকড়ের সাথে যুক্ত। গ্রামীণ ঐতিহ্যের বিচারে আলুভর্তাই বেশি ‘খাঁটি’ ও মাটির কাছের। এ ছাড়া আম মানুষের সহজলভ্য এটি।
ইলিশ হলো বাঙালির উৎসবের নয়া আমেজ। আলুভর্তা হলো বাঙালির প্রাণের টান ও চিরচেনা অভ্যাস।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন