মানুষের অন্ত্রে পরজীবী হিসেবে বাস করা কৃমি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ক্রান্তীয় ও উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে এর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এবং সচেতন থাকলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
কৃমি হওয়ার প্রধান কারণসমূহ
পেটে কৃমি হওয়ার পেছনে মূলত অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও দূষিত পরিবেশ দায়ী। প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
দূষিত খাবার ও পানি: কৃমির ডিম মিশ্রিত পানি পান করা বা সেই পানি দিয়ে ধোয়া শাকসবজি ও ফলমূল কাঁচা খেলে কৃমি হতে পারে।
অপরিচ্ছন্ন হাত: শৌচাগার ব্যবহারের পর বা খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত না ধোয়া।
খালি পায়ে হাঁটা: বিশেষ করে হুকওয়ার্ম বা বড়শির মতো দেখতে কৃমিগুলো মাটি থেকে সরাসরি মানুষের পায়ের চামড়া ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করে।
কাঁচা বা আধা-সেদ্ধ মাংস: গবাদি পশু বা শুকরের মাংস ভালোভাবে সেদ্ধ না করে খেলে ফিতা কৃমিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
নখ কামড়ানোর অভ্যাস: নখের নিচে জমে থাকা ময়লা ও কৃমির ডিম খাওয়ার মাধ্যমে সরাসরি পেটে চলে যায়।
কৃমি সংক্রমণের লক্ষণসমূহ
অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তারা কৃমিতে আক্রান্ত। সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে:
১. পেট ব্যথা এবং পেটে অস্বস্তি।
২. হজমের সমস্যা বা বারবার পাতলা পায়খানা।
৩. মলদ্বারে চুলকানি (বিশেষ করে রাতে)।
৪. খাবারে অরুচি বা অতিরিক্ত ক্ষুধা পাওয়া।
৫. দ্রুত ওজন কমে যাওয়া ও রক্তশূন্যতা।
৬. সারাক্ষণ ক্লান্তি অনুভব করা ও চেহারায় ফ্যাকাশে ভাব।
৭. শিশুদের ক্ষেত্রে অস্থিরতা এবং রাতে ঘুমের ব্যাঘাত।
কৃমি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা
কৃমি থেকে বাঁচতে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। এর জন্য নিচের নিয়মগুলো মেনে চলা জরুরি:
বিশুদ্ধ পানি: সবসময় ফুটিয়ে বা ফিল্টার করা নিরাপদ পানি পান করুন।
খাদ্য নিরাপত্তা: শাকসবজি ও ফলমূল রান্নার আগে বা খাওয়ার আগে প্রচুর পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। মাংস সবসময় ভালো করে সেদ্ধ করে রান্না করুন।
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা: নিয়মিত নখ কাটুন এবং পরিষ্কার রাখুন। খাবার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
জুতো ব্যবহার: বাড়ির বাইরে বা কাঁচা মাটিতে চলাফেরার সময় সবসময় স্যান্ডেল বা জুতো পরুন।
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা: বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখুন এবং খোলা জায়গায় মলত্যাগ বন্ধ নিশ্চিত করুন।
কৃমির আধুনিক চিকিৎসা ও প্রতিকার
যদি কৃমি হয়েই যায়, তবে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বর্তমানে অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ ওষুধ বাজারে রয়েছে।
কৃমিনাশক ওষুধ: ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী 'অ্যালবেনডাজল' বা 'মেবেনডাজল' জাতীয় ওষুধ সেবন করতে হবে।
পরিবারসহ চিকিৎসা: কৃমি ছোঁয়াচে হতে পারে, তাই পরিবারের একজনের হলে সবারই একসঙ্গে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়া উচিত।
নিয়মিত সেবন: প্রতি ৬ মাস অন্তর পরিবারের সবাইকে (২ বছরের উপরের শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে) নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেয় স্বাস্থ্য সংস্থা।
সতর্কতা: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া হুটহাট কৃমির ওষুধ সেবন করবেন না, বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এটি বাধ্যতামূলক।


