শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


জুবায়ের দুখু

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৯, ২০২৫, ০৮:০১ পিএম

এআইকে ভালোবাসার পাশাপাশি মানুষ ঘৃণা করে কেন?

জুবায়ের দুখু

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৯, ২০২৫, ০৮:০১ পিএম

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

ইমেল লেখার সাহায্য থেকে শুরু করে টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সুপারিশ করা, এমনকি রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করা- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। এটি আর কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়; বরং হাতের নাগালের প্রযুক্তি। তবুও গতি, নির্ভুলতা ও দক্ষতার অগণিত প্রতিশ্রুতির মাঝেও একটি স্থায়ী অস্বস্তি রয়ে গেছে। কেউ এসব সরঞ্জামকে স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করেন, আবার কেউ সন্দেহ, ভয় কিংবা প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি নিয়ে দূরত্ব বজায় রাখেন।

কেন এই দ্বিধা? এর উত্তর কেবল প্রযুক্তির ভিতরে নয়, আমাদের মনের ভেতরেও লুকিয়ে আছে। আজ বলব সেই প্রশ্নের উত্তর...

অদৃশ্য যুক্তি, অদৃশ্য বিশ্বাস

মানুষ সাধারণত সেই ব্যবস্থার ওপর বেশি বিশ্বাস রাখে, যার কার্যপ্রণালী বোঝা যায়। চাবি ঘোরালে গাড়ি চলে, বোতাম চাপলে লিফট আসে- কারণ ও ফলাফলের যোগসূত্র স্পষ্ট। কিন্তু অনেক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি কালো বাক্সের মতো। ইনপুট দিলেই সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে- মাঝখানের যুক্তি অদৃশ্য।

এই অস্বচ্ছতাই মনস্তত্ত্বে একটি অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ মানুষ স্বভাবগতভাবে যেকোনো ফলাফলের ব্যাখ্যা খোঁজে। সে ব্যাখ্যা পুরোপুরি না পেলে মানুষের নিয়ন্ত্রণে হারানোর অনুভূতি জন্মায়।

এই প্রেক্ষাপটে গবেষক বার্কলে ডিটভোর্স্ট ও তার সহকর্মীদের তুলে ধরা একটি ধারণা গুরুত্বপূর্ণ- সেটি হলো অ্যালগরিদম বিমুখতা। তাদের গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ অনেক সময় ত্রুটিপূর্ণ হলেও মানবিক সিদ্ধান্তকে পছন্দ করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্তের চেয়ে। এমনকি অ্যালগরিদমের সামান্য ভুলও ব্যবহারকারীর আস্থা তীব্রভাবে নষ্ট করতে পারে।

যন্ত্রে মানুষের প্রতিচ্ছবি

আমরা জানি- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনো আবেগ নেই, নেই ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য। তবুও আমরা অনায়াসে সেগুলোর ওপর মানুষের মতো গুণ আরোপ করি।

এ সম্পর্কে যোগাযোগের গবেষক ক্লিফোর্ড ন্যাস ও বায়রন রিভস দেখিয়েছেন- মানুষ যন্ত্রের প্রতি প্রায়ই সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখায়, যদিও সেগুলো মানুষ নয় তা জানার পরও।

এই মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা কখনো ভয় সৃষ্টি করে। যেমন- চ্যাটবট খুব ভদ্রভাবে কথা বললে কেউ কেউ অস্বস্তি বোধ করেন। আবার সুপারিশ ব্যবস্থা একটু বেশি নির্ভুল হলে তা অনুপ্রবেশের মতো মনে হয়। তখন আমরা কারসাজির সন্দেহ করতে শুরু করি- যদিও সিস্টেমের কোনো ব্যক্তিগত সদিচ্ছা বা উদ্দেশ্য নেই।

মানুষের ক্ষমা আছে, যন্ত্র ভুল করলে বিরক্তি

মানুষ ভুল করলে আমরা বুঝি- কারণ সে মানুষ। ভুল স্বাভাবিক, এমনকি সহানুভূতিও জন্মায়। কিন্তু একই ভুল যদি কোনো অ্যালগরিদম করে- হয়তো ভুলভাবে একটি ছবি শ্রেণিবিন্যাস করল কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট পরামর্শ দিল- তাহলে আমরা যেন বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি পাই।

আমরা মেশিনকে নিখুঁত হওয়ার আশা করি। ফলে তাদের ভুল আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

এটি প্রত্যাশা লঙ্ঘন সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে- যখন কোনো অ্যালগরিদমের আচরণ মানুষের ধারণার সঙ্গে না মেলে, তখন তা থেকে মানুষের ভরসা খুব সহজেই নষ্ট হয়।

পরিচয়ের সংকট

শুধু প্রযুক্তি নয়, অনেকের উদ্বেগের মূলে আছে নিজেদের পেশাগত পরিচয়। শিক্ষক, আইনজীবী, লেখক বা ডিজাইনারদের অনেকেই হঠাৎ দেখছেন- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের কাজের কিছু অংশ করে ফেলতে পারে।

এই অনুভূতিকে মনোবিজ্ঞানী ক্লড স্টিল পরিচয় হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন- অর্থাৎ নিজের দক্ষতা, স্বাধীনতা বা মূল্য কমে যাওয়ার ভয়। ফলে প্রযুক্তির প্রতি প্রতিরোধ, সন্দেহ বা অস্বীকার- সবই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এটি ত্রুটি নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষা।

আবেগের অভাব

মানুষের আস্থার অন্যতম স্তম্ভ হলো আবেগগত ইঙ্গিত। স্বর, দৃষ্টি, মুখের ভাব, ক্ষুদ্র বিরতি- এসবই আমাদের আশ্বস্ত করে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় এই মানবীয় স্বরূপ নেই। তার ভাষা সাবলীল হলেও আবেগের অনুপস্থিতি আমাদের বিভ্রান্ত করে।

জাপানি রোবোটিস্ট মাসাহিরো মোরির ‘অদ্ভুত উপত্যকা’ ধারণা এখানে প্রযোজ্য- যখন কোনো জিনিস প্রায় মানুষের মতো, কিন্তু পুরোপুরি নয়; তখন তা অস্বস্তি তৈরি করে।

সমাজে যখন ভুয়া ভিডিও, ভুয়া কণ্ঠ আর অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্ত বাড়ছে, তখন এই আবেগগত শূন্যতা অনেককে আরও সতর্ক করে তোলে।

অ্যালগরিদমের পক্ষপাত

সব অনাস্থা অযৌক্তিক নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রায়ই বিদ্যমান পক্ষপাত প্রতিফলিত করে- নিয়োগ, ঋণ মূল্যায়ন, পুলিশি নজরদারি- যেখানে ভুলের প্রভাব হতে পারে গভীর।

যারা অতীতে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের সন্দেহ ভীতি নয়- সতর্কতা। মনস্তত্ত্বে এটি শেখা অবিশ্বাস নামে পরিচিত। বারবার ব্যর্থতা বা বৈষম্য কেউই সহজে ভুলতে পারে না।

শুধু ‘সিস্টেমকে বিশ্বাস করতে হবে’ বলা কখনো কাজ করে না। বিশ্বাস কেবল দাবিই নয় এটি অর্জনও বটে।

তার জন্য দরকার এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা- যা স্বচ্ছ, ব্যাখ্যাযোগ্য, প্রশ্নযোগ্য এবং ব্যবহারকারীকে নিয়ন্ত্রণ দেয়। মানসিকভাবে মানুষ সেই ব্যবস্থাকেই বিশ্বাস করে- যা তাকে বোঝায়, তাকে শ্রদ্ধা করে এবং তাকে অংশীদার মনে করে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণযোগ্য হতে হলে এটিকে যেন অচেনা কালো বাক্সের মতো না লাগে; বরং আমাদের আমন্ত্রণ জানানো একটি নির্ভরযোগ্য কথোপকথনের মতো অনুভূত হতে হবে।

Link copied!