যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বিদেশে বসে পাসপোর্ট হাতিয়ে নিয়েছেন পলাতক সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুই সন্তান। অর্থপাচার তদন্তাধীন ও দেশত্যাগের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়া জাবেদের মেয়ে জেবা জামান ও ছেলে তানয়ীম জামান চৌধুরীর ই-পাসপোর্ট ইস্যু ঘিরে গুরুতর অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে দুবাইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত দ্বিতীয় সচিব সাজ্জাদ জহিরের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন সাজ্জাদ জহির। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল হলেও তিনি দুবাইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের দ্বিতীয় সচিব রয়েই গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, অভ্যুত্থানের পর দেশ থেকে পালিয়ে দুবাইতে আশ্রয় নেওয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মী ও সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের আশ্রয় দিচ্ছেন সাজ্জাদ জহির।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর একমাত্র কন্যা জেবা জামান বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাস করছেন। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর জেবা তার হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশি পাসপোর্ট (নম্বর : এ ১৫৯০০৯৪৫) পুনঃইস্যুর জন্য দুবাইয়ের বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলে আবেদন করেন। এ সময় কনস্যুলেটে তার আবেদনটি গৃহীত হয় ও বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট সম্পন্ন করে তার অনুকূলে একটি পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট আইডি (৫০০২০০০৩৩৪৩১০) ইস্যু করা হয়। আবেদনপত্রে তিনি বর্তমান ঠিকানা হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পরিবর্তে চট্টগ্রামের একটি ঠিকানা উল্লেখ করা সত্ত্বেও আবেদনটি কনস্যুলেটে গৃহীত ও তার বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট সম্পন্ন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ইতোপূর্বে তার ভাই তানয়ীম জামান চৌধুরীর মতো জেবা জামানের পাসপোর্টটিও ইস্যুর ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তড়িঘড়ি আবেদনটি নিষ্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়।
এর আগে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ছেলে তানয়ীম জামান চৌধুরীর ই-পাসপোর্টও একই কৌশলে দুবাইতে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে ইস্যু করা হয়। জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি তানয়ীমের ই-পাসপোর্ট এনরোল করা হয় এবং অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে ২৪ জানুয়ারি তার পাসপোর্টটি (নম্বর : এ ১৭৫৪৪৪৯২) অতি গোপনে কনস্যুলেট থেকে সরবরাহ করা হয়। সেই একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জেবা জামানের পাসপোর্টটিও গোপনে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল বলে কনস্যুলেটের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ উঠেছে। এতে কনস্যুলেটের বিগত সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া প্রটোকল কর্মকর্তা সাজ্জাদ জহিরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কনস্যুলেটের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, তানয়ীমের পাসপোর্ট ইস্যুর সময় প্রটোকল কর্মকর্তা সাজ্জাদ জহির এনরোলমেন্ট থেকে শুরু করে পাসপোর্ট হস্তান্তর পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সহজ করে দিতে সরাসরি ভূমিকা পালন করেন। জেবা জামানের পাসপোর্ট আবেদনের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাজ্জাদের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে পাসপোর্ট ইস্যুর আবেদনটি বাংলাদেশ দূতাবাস আবুধাবিতে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও সাজ্জাদের পরামর্শে ও আশ্বাসে আবেদনটি শেষ পর্যন্ত দুবাই কনস্যুলেটে জমা দেওয়া হয়। তানয়ীমের পাসপোর্টটি দুবাই কনস্যুলেট থেকে সফলভাবে ডেলিভারি হওয়ায় জেবার ক্ষেত্রেও সাজ্জাদ দ্রুত গতিতে পাসপোর্ট ইস্যুকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন মর্মে আশ্বাস দেন। এ ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের টাকাও লেনদেন হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরবর্তীতে ফার্স্ট সেক্রেটারির (পাসপোর্ট) হস্তক্ষেপে কনস্যুলেট থেকে জেবার পাসপোর্ট ইস্যুর উদ্যোগটি ভেস্তে যায় বলে জানা গেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত উল্লিখিত পাসপোর্ট আবেদনের বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য কনস্যুলেট থেকে একটি পত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
কে এই সাজ্জাদ জহির?
বর্তমানে সেকেন্ড সেক্রেটারি (চুক্তিভিত্তিক) পদে কর্মরত সাজ্জাদ জাহির ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে দুবাইয়ে স্থানীয়ভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে প্রটোকল সহকারী পদে নিয়োগ পান। তৎকালীন কনস্যুলার জেনারেল আমিনুল হোসেন সরকারের নাতি হিসেবে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে সাজ্জাদকে কনস্যুলেটে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে তাকে পূর্ণ কূটনৈতিক মর্যাদা দেওয়া হয়। ইতিপূর্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে কোনো স্থানীয়ভিত্তিক কর্মচারীকে পূর্ণ কূটনৈতিক মর্যাদা দেওয়ার নজির নেই। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে হাসিনার পুত্র জয় ও কন্যা পুতুলের প্রটোকল সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে এ নিয়োগ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। দলীয় কানেকশনের সূত্র ধরে সাজ্জাদ সজীব ওয়াজেদ জয়কে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন। জয় ও পুতুল সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেলে তিনি এককভাবে তাদের প্রটোকল সেবা দিতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও সাজ্জাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়নি। বরং তিনি বহাল তবিয়তে দুবাইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছেন বলে জানা যায়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সাজ্জাদ বর্তমানে প্রশাসনিকভাবে ব্যাপক ক্ষমতা ভোগ করছেন এবং এমআরপি পাসপোর্ট সংক্রান্ত কার্যক্রম, প্রটোকল সেবা প্রদান ও বিভিন্ন কনস্যুলার নথিতে স্বাক্ষরের ক্ষমতা ভোগ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রেখে দুবাইয়ে তাদের সরকারি ও বেসরকারি সফরে প্রটোকল সেবা দিয়ে আসছেন। এমনকি গণঅভ্যুত্থানের পরও গোপনে তিনি অনেক সাবেক মন্ত্রী ও এমপিকে দুবাই এয়ারপোর্টে নিরাপত্তা বেষ্টনী হয়ে প্রটোকল সেবা প্রদান করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সব রাজনৈতিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হলেও সাজ্জাদ জহিরের চুক্তি বহাল থাকে। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে বলে চুক্তিপত্রে উল্লেখ রয়েছে। সাজ্জাদের চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে সুপারিশ করে কনস্যুলেট থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠানো হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সেটি অগ্রায়ন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন সেটি জনপ্রশাসন মন্ত্রাণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। এতে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে দুবাইয়ে আশ্রয় নেওয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটের ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে যেকোনো ধরনের ডকুমেন্টে কনস্যুলেটের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। নিজেদের দলীয় লোক থাকলে সহজেই কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। সাজ্জাদের স্বপদে বহাল থাকার ফলে কনস্যুলেটের অভ্যন্তরে যেকোনো কনস্যুলার সহায়তা প্রাপ্তি এসব নেতার জন্য সহজ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাইফুজ্জামানের ছেলের পাসপোর্ট ইস্যুকরণের মাধ্যমে সেই আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হয়েছে। এতকিছুর পরও সাজ্জাদের চুক্তি কীভাবে বহাল আছেÑ তা সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন প্রবাসীরা।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর থেকেই তদন্তের আওতায় রয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি অবৈধ উপায়ে প্রায় বারোশ কোটি টাকা বিদেশে পাচার ও সম্পদ অর্জন করেছেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হয় দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটে প্রটোকল অফিসার সাজ্জাদ জহিরের সঙ্গে। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমার ২৭ বছর চাকরির জীবনে কোনো দুর্নীতি, অনৈতিক কাজ করিনি। এই সততাই আমার বড় সম্পদ। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।’
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি প্রটোকলের দায়িত্বে আছি। সরকারের যারা যখন থাকেন তাদের প্রটোকলের বাইরে কোনো কাজ করছি কি না খোঁজ নিয়ে দেখুন। আমি খালেদা জিয়ারও প্রটোকলের দায়িত্বে ছিলাম। আমার কাজই হচ্ছে প্রটোকল দেওয়া। গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত সরকারের কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তাদের কারো সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই।’
এর কিছু সময় পর সাজ্জাদ জহির এ প্রতিবেদকের নম্বরে মেসেজ দিয়ে লেখেন, ‘ভাই, আপনার উচিত যারা আমার নামে এসব অপপ্রচার করছে তাদের উদ্দেশ্য কী তা বের করা। তাদের জিজ্ঞেস করুন কেন আমার পেছনে তারা এসব করছে, কারা করাচ্ছে? কি সমস্যার কারণে তারা এসব মিথ্যা অপপ্রচার করাচ্ছে। একজন সৎ পথের মানুষ তাদের জন্য কী বাধা হয়ে দাঁড়াল।’
এ বিষয়ে দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল মো. রাশেদুজ্জামানকে ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও কোনো উত্তর মেলেনি।
দুবাইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর পুত্র তানয়ীমের পাসপোর্টটি দুবাই কনস্যুলেট থেকে সফলভাবে সরবরাহ হলেও ফার্স্ট সেক্রেটারির (পাসপোর্ট) হস্তক্ষেপে কনস্যুলেট থেকে কন্যা জেবার পাসপোর্ট ইস্যুর উদ্যোগটি ভেস্তে যায়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত উল্লিখিত পাসপোর্ট অনুমোদনের বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য কনস্যুলেট থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠির বিষয়টি জানতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বহিরাগমন অনুবিভাগ) ফয়সল আহমেদকে ফোন করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে বলেন। এরপর বিস্তারিত জানাবেন বলে লাইন কেটে দেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন