জাতীয় সরকার বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয় এমন একটি সরকার, যেখানে দেশের একাধিক প্রধান রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী একত্রে অংশগ্রহণ করে। এই সরকার দৃশ্যত জনগণের সামগ্রিক স্বার্থে কাজ করে এবং দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শাসনব্যবস্থা পরিচালনার চেষ্টা করে। সাধারণত কোনো দেশের বিশেষ রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক সংকটের সময় জাতীয় সরকার গঠিত হয়।
কেন জাতীয় সরকার?
জাতীয় সরকার গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করা এবং গভীর সংকট মোকাবিলায় সব রাজনৈতিক শক্তিকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনা। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, গণতান্ত্রিক রূপান্তর বা দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতিতে এ ধরনের সরকার রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
জাতীয় সরকার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক শাসন নয়। এটি মূলত একটি বহুদলীয় সরকার, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতা ভাগাভাগির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেয়। তাই জাতীয় সরকারকে বিশেষ পরিস্থিতিতে গঠিত একটি সমঝোতাভিত্তিক শাসনব্যবস্থা বলা যায়।
বিশ্বে জাতীয় সরকার
বিশ্ব রাজনীতিতে জাতীয় সরকার গঠনের একাধিক নজির রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি রাষ্ট্রের ঘটনা তুলে ধরা হলো।
যুক্তরাজ্য : ১৯৩০-এর দশকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সময় যুক্তরাজ্যে একটি জাতীয় সরকার গঠিত হয়। এই সরকারে লেবার পার্টি, কনজারভেটিভ পার্টি ও লিবারেল পার্টির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করা।
ইতালি : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর ইতালিতে জাতীয় সরকার গঠিত হয়। যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এতে অংশগ্রহণ করে।
দক্ষিণ আফ্রিকা : এপার্থাইড ব্যবস্থার অবসানের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠিত হয়। এতে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস, ন্যাশনাল পার্টি ও ইনকাথা ফ্রিডম পার্টি অংশ নেয়। জাতিগত ও রাজনৈতিক বিভক্তি কাটিয়ে উঠতে এই সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রসঙ্গ বাংলাদেশ
বাংলাদেশে জাতীয় সরকার গঠনের আলোচনা নতুন নয়। ২০২১ সালে এ ধরনের একটি সরকার গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। বাস্তবে বাংলাদেশে কখনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় সরকার গঠিত হয়নি।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে গঠিত নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে জাতীয় সরকার বলা যায় না। কারণ এসব সরকার ছিল নির্দলীয়। এতে মূলত সাবেক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকায় এগুলো জাতীয় সরকারের সংজ্ঞার সঙ্গে মেলে না।
২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংগঠন ব্লাস্টের আয়োজিত এক আলোচনায় একজন সিনিয়র আইনজীবী তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘ভালো মানুষের সরকার’ বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বইছে ভোটের হাওয়া। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচন কিছুটা ব্যতিক্রমী। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম ভোটাররা এক ব্যালটে তাদের পছন্দের সংসদ সদস্য নির্বাচন করবেন এবং অন্য ব্যালটে গণভোটে অংশ নিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ রায় দেবেন।
ভোটে যে দল বা জোট বেশি আসনে জিতবে, তারাই সরকার গঠন করবে; দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হবে বিরোধী দল—সংসদীয় গণতন্ত্রের সূত্র অনুযায়ী হিসাবটি সহজ। তবে সহজ হিসাব অনেক সময় সহজে মেলে না। ভূরাজনীতির গ্যাঁড়াকলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনীতির সরল অঙ্কও মাঝেমধ্যে জটিল হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই আবার সামনে এসেছে ‘জাতীয় সরকার’ প্রসঙ্গ। গুঞ্জন উঠেছে, নির্বাচনের পর একটি জাতীয় সরকার গঠিত হতে পারে। সেই সরকারই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেবে।
রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারে জাতীয় সরকার গঠনের আলোচনা নতুন নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই এ ধরনের একটি সরকার গঠনের প্রস্তাব ওঠে, যাতে রাষ্ট্রকাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলা যায়।

