ভূতাত্ত্বিক পরিভাষায় ছোট ছোট ভূমিকম্পকে অনেক সময় ফোরশক (Foreshock) বলা হয়। তবে সব ছোট ভূমিকম্পই যে বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে ছোট কম্পনগুলো মাটির নিচের সঞ্চিত শক্তি বের করে দিয়ে বড় দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। কিন্তু যখন একটি নির্দিষ্ট ফল্টলাইনে ঘন ঘন ছোট কম্পন হতে থাকে, তখন বিজ্ঞানীরা সেটিকে অস্বাভাবিক সক্রিয়তা হিসেবে গণ্য করেন, যা বড় ফাটলের ইঙ্গিত হতে পারে।
এই উপমহাদেশে চারটি ফল্টলাইনের কথা উল্লেখ করা হয়, সেগুলো বর্তমানে অত্যন্ত সক্রিয় এবং দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ।
ডাউকি ফল্ট (শিলং মালভূমি) : এটি সিলেট সীমান্তের খুব কাছে অবস্থিত। ঐতিহাসিক রেকর্ড অনুযায়ী, এই ফল্টলাইনে বড় ধরনের ভূমিকম্প তৈরির শক্তি জমা হয়ে আছে।
কোপিলি ফল্টলাইন (আসাম) : উত্তর-পূর্ব ভারতের এই অঞ্চলটি নিয়মিত কাঁপছে। এখান থেকে উৎপন্ন কম্পন ঢাকা ও সিলেটে তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
হিমালয়ের মেইন থ্রাস্ট (Main Himalayan Thrust) : নেপাল থেকে শুরু করে ভারতের উত্তর সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই লাইনটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা।
সাগাইং ফল্ট (বার্মা সাবপ্লেট) : এটি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। টেকনাফ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্লেটটি বর্তমানে অত্যন্ত 'লকড' বা সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
গত কয়েক মাসে সিলেট, চট্টগ্রাম এবং ঢাকাসংলগ্ন এলাকায় বেশ কিছু মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়েছে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে একই দিনে কয়েকবার মৃদু কম্পন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ছোট ছোট কম্পন প্রমাণ করে যে মাটির নিচের টেকটোনিক প্লেটগুলো নড়াচড়া করছে এবং বড় কোনো চ্যুতি ঘটার মতো শক্তি সঞ্চয় করছে।
কেন আমরা ঝুঁকির মুখে?
বাংলাদেশ একটি বিশাল বদ্বীপ, যা পলিমাটি দিয়ে গঠিত। মাটির গঠন নরম হওয়ায় দূরবর্তী কোনো ফল্টলাইনে কম্পন হলেও বাংলাদেশে তার তীব্রতা এবং স্থায়িত্ব বেশি অনুভূত হয়। বিশেষ করে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম ঘনবসতিপূর্ণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
সতর্কতা ও করণীয়
বড় ভূমিকম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়, তবে প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমানো যায়।
ব্যক্তিগত সুরক্ষা : ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত না হয়ে 'ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড অন' পদ্ধতি অনুসরণ করুন। শক্তিশালী টেবিল বা খাটের নিচে আশ্রয় নিন।
হেলমেট ব্যবহার : আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিপজ্জনক বা পুরোনো ভবনের বাসিন্দাদের জন্য মাথায় আঘাত থেকে বাঁচতে হেলমেট সঙ্গে রাখা একটি চমৎকার ও জীবন রক্ষাকারী বুদ্ধি হতে পারে।
জরুরি ব্যাগ : একটি ব্যাগে কিছু শুকনো খাবার, পানি, টর্চলাইট, বাঁশি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সব সময় গুছিয়ে দরজার কাছে রাখুন।
ভবন পরীক্ষা : বাড়ির কলাম বা দেয়ালে বড় কোনো ফাটল দেখা দিলে দ্রুত প্রকৌশলীর পরামর্শ নিন।
ছোট ছোট ভূমিকম্প আমাদের প্রকৃতিপ্রদত্ত একটি সতর্কবার্তা। একে অবহেলা না করে ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করাই এখন সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন