ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার তথা ফ্যাসিবাদের দোসর, প্রভাবশালী ও গণহত্যায় অভিযুক্ত পুলিশের শতাধিক কর্মকর্তার অধিকাংশই বর্তমানে পলাতক বা আত্মগোপনে রয়েছেন। ধীরে ধীরে তাদের কেউ কেউ দেশে-বিদেশে প্রকাশ্যে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হচ্ছেন। তারা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পক্ষে ন্যারেটিভ তৈরিতে ব্যস্ত। পাশাপাশি বর্তমান সরকার, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্তদের নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যাদের নির্দেশে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতাকে হত্যায় পুলিশ অংশ নেয়, তারাই এখন গণহত্যায় জড়িত পুলিশের পক্ষে জনমত তৈরির কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তাদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে গুম, নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অনুসারী এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী শতাধিক প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা আত্মগোপনে থেকে বাহিনীতে থাকা নিজেদের অনুসারী ও দলীয় সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এমন তথ্য একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পালিয়ে যাওয়া এবং কর্মস্থলে যোগদান না করা প্রায় অর্ধশতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে সর্বশেষ দুই সরকার বরখাস্ত করেছে। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতা গণহত্যার মামলায় অভিযুক্ত অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। পলাতকদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, পাসপোর্ট ও সম্পদ জব্দ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে পালিয়ে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের দেশে ফেরাতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) অনুরোধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করেছে। গত বছর ১৯ মে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাবেক প্রধান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়ার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। যদিও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, তিনি দেশে আত্মগোপনে রয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। সুযোগ পেলেই দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, তিনি পলাতক।
ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলের গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত অপরাধী এবং বিদেশে পলাতক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া গত ২০ মাসেও কার্যকরভাবে শুরু হয়নি। অতীতে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রক্রিয়া চলমান। তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই বললেই চলে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিদেশে পালিয়ে যাওয়া এসব কর্মকর্তাকে এখনো দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি কেন। এমনকি অধিকাংশের অবস্থানও শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ সদর দপ্তর। একাধিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, অনেকেই মামলা দায়ের ও বরখাস্তের পরও অদৃশ্য পৃষ্ঠপোষকতায় দেশ ছাড়তে সক্ষম হয়েছেন। পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের সদিচ্ছার অভাবেই পলাতক কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার বা দেশে ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ পুলিশ চাইলে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ বা মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাগ্রিমেন্ট (এমএলএএ)-এর মাধ্যমে যেকোনো দেশ থেকে পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দলীয় লেজুড়বৃত্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া অধিকাংশ ‘বিতর্কিত ও অপরাধী’ পুলিশ কর্মকর্তা এখনও পলাতক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের আল্টিমেটাম সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের এসব প্রভাবশালী কর্মকর্তা আর কর্মস্থলে যোগ দেননি। তাদের ‘অপরাধী’ হিসেবে শনাক্ত করা হলেও খুঁজে পাচ্ছে না বাহিনী। অভিযোগ রয়েছে, সময়মতো গ্রেপ্তার না করায় তারা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার বা দেশে আত্মগোপনে থাকার সুযোগ পেয়েছেন। এরই মধ্যে অর্ধশতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং আরও অর্ধশতাধিক গ্রেপ্তার হয়ে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। পুলিশের রাজনৈতিক ভূমিকা ও ব্যাপক দমন-পীড়নের কারণেই কোটাবিরোধী আন্দোলন ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনে’ রূপ নেয়। এর পরিণতিতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বরখাস্ত ও অবসরে পাঠানো অধিকাংশ কর্মকর্তা আত্মগোপনে রয়েছেন বা পলাতক। কেউ দেশের বাইরে, আবার কেউ দেশের ভেতরেই লুকিয়ে আছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম বেনজীর আহমেদ, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের মনিরুল ইসলাম এবং ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, হারুন অর রশীদ ও বিপ্লব কুমার সরকার। বেনজীর আহমেদ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগেই গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম ভারতের দিল্লিতে পালিয়ে গেলেও ফেসবুকে সক্রিয় থেকে দেশে আত্মগোপনে থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। হাবিবুর রহমান বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। তিনি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সীমান্ত পাড়ি দেন। ৫ আগস্টের পর ডিএমপির সাবেক এই কমিশনারের সরকারি বাসভবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী সরাতে পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সহায়তা করেন।
নানা বিতর্কে সমালোচিত ডিবির ‘ভাতের হোটেল’-এর উদ্যোক্তা এবং অর্ধশতাধিক মামলার আসামি ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার হারুন-অর-রশীদ কানাডায় পালিয়ে গিয়ে বর্তমানে সেখানে বসবাস করছেন। অ্যাডিশনাল ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার তিন কোটি টাকার বিনিময়ে এক রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়ে উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদার এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় ৫ আগস্ট থেকেই নিখোঁজ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তারা দু’জনই ভারতে অবস্থান করছেন।
অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার ভারতে পালিয়ে গিয়ে দিল্লিতে আবাসন ব্যবসা করছেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে ছাত্র-জনতাকে দমনে অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন তিনি। সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্যের লন্ডন এবং যুক্তরাষ্ট্রে তার বাড়ি রয়েছে। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযানের নামে বোমা রেখে তা উদ্ধার দেখিয়ে আলোচনায় আসা অ্যাডিশনাল ডিআইজি এস এম মেহেদী হাসানও যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে বর্তমানে কলকাতায় অবস্থান করছেন।
বিদেশে পলাতকদের মধ্যে রয়েছেন ডিআইজি নূরে আলম মিনা, জাহাঙ্গীর হোসেন মাতব্বর, নুরুল ইসলাম, মোল্লা নজরুল ইসলাম, মোজাম্মেল হক এবং আব্দুল বাতেন। এছাড়া অ্যাডিশনাল ডিআইজি নুরুন্নবী চৌধুরী, সঞ্জীব চক্রবর্তী, শাহ মিজান শাফিউর রহমান, সুদীপ কুমার, মাশরুকুর রহমান খালেদ, সাজ্জাদুর রহমান, আনিসুর রহমান, ইলিয়াস শরীফ এবং মাসুদ আলমও পলাতক। পুলিশ সুপার শাহজাহান সাজু, রিফাত শামীম, নাজমুল ইসলাম সুমন এবং ডিএমপির সহকারী কমিশনার (এসি) গোলাম রুহানী পুলিশের খাতায় পলাতক হিসেবে তালিকাভুক্ত। এর আগে তাদের বিভিন্ন জেলায় বদলি করা হলেও তারা যোগদান না করায় পরে বরখাস্ত করা হয়।
হত্যা মামলা থাকা সত্ত্বেও ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিডনির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মীর রেজাউল আলম। সরকার পতনের পরদিনই পালিয়ে যান বহুল আলোচিত সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ, যিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্টই তিনি দেশ ছাড়েন।
ডিএমপির সাবেক কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে ৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট তিনি ব্যাংককে যাওয়ার জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ডিবিকে জানানো হলে তার দেশত্যাগে আপত্তি জানানো হয় এবং তিনি ফিরে আসেন। তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যাচেষ্টার মামলা রয়েছে। পরে আবার দেশত্যাগের চেষ্টা করলে ২৬ অক্টোবর রাত আড়াইটায় বিমানবন্দরে তাকে আটকানো হয়।
২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্টের পর (অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ৪০ দিন পর্যন্ত) বাংলাদেশ পুলিশের ১৮৭ জন সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ডিআইজি, সাতজন অতিরিক্ত ডিআইজি, দুজন পুলিশ সুপার, একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পাঁচজন সহকারী পুলিশ সুপার, পাঁচজন পরিদর্শক, ১৪ জন এসআই ও সার্জেন্ট, ৯ জন এএসআই, ৭ জন নায়েক এবং ১৩৬ জন কনস্টেবল রয়েছেন। এর মধ্যে ৪৯ জন কর্মস্থলে অনুপস্থিত, ৩ জন স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়েছেন, ৯৬ জন ছুটি শেষে আর কাজে ফেরেননি এবং অন্যান্য কারণে ৩৯ জন অনুপস্থিত। তাদের কেউই পরে আর যোগ দেননি। বারবার নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা সাড়া দেননি এবং বর্তমানে পুলিশের খাতায় পলাতক হিসেবে তালিকাভুক্ত।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসাইন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, পলাতক আসামি ধরতে পুলিশ সবসময় সক্রিয়। সাবেক বা বর্তমান সদস্য সবার জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য। বিদেশে পলাতকদের ক্ষেত্রে এনসিবির মাধ্যমে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। আদালতে সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের সব ইউনিট একযোগে কাজ করছে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী র্যাব দেশে-বিদেশে পলাতক আসামিদের ধরতে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালাচ্ছে। গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করে তাদের গ্রেপ্তারে কাজ অব্যাহত রয়েছে।

